যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ সাময়িক বিরতি থাকলেও উত্তেজনার পারদ ক্রমেই বাড়ছে। লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পর ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ‘সময় কিন্তু তেহরানের পক্ষে নয়।’ ট্রাম্পের দাবি, ‘যুক্তরাষ্ট্র চাপে নেই, বরং সময় ফুরিয়ে আসছে তেহরানের।’
ট্রাম্প এমন হম্বিতম্বি করলেও তাতে খুব বেশি পাত্তা দিচ্ছে না ইরান। বরং ইরানের নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জোরালো প্রচারনা চালাচ্ছেন, আমরা সবাই ‘ইরানি’ এবং ‘বিপ্লবী’।
আল জাজিরা এবং ইরানি সংবাদ মাধ্যম পার্সটুডে’র তথ্য অনুযায়ী লেবাননের সঙ্গে তিন সপ্তাহের যুদ্ধ বিরতি চুক্তি বাড়ানোর পর ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করেছেন। আর ইরানি কর্তৃপক্ষ নিজেরা ঐক্যবদ্ধ এবং কোনো শক্তির কাছে মাথা নত করবেন বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, লেবাননে চলমান যুদ্ধবিরতি রোববার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই তিনি ইসরায়েল ও লেবাননের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক আয়োজন করতে চান, যাতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খোঁজা যায়।
তবে এই ইতিবাচক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাঝেও ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও কঠোর হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তিনি ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বা সংকট শেষ করতে কোনো তাড়াহুড়া অনুভব করছেন না। বরং তার দাবি -সময় যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকলেও ইরানের হাতে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘আমার হাতে যত সময় দরকার আছে, কিন্তু ইরানের নেই -ঘড়ির কাঁটা তাদের জন্য দ্রুত চলছে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বক্তব্যের মাধ্যমে ওয়াশিংটন মূলত তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে চাইছে, যাতে তারা দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়। একই সঙ্গে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনায় বসতে চায়।

এদিকে লেবানন ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। কয়েক সপ্তাহ ধরে ইসরায়েলি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল, যা আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। যুদ্ধবিরতির ফলে সাময়িকভাবে সহিংসতা কমলেও স্থায়ী সমাধান এখনো অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ বিরতির মেয়াদ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে মূলত ইরানি দাবি কিছুটা হলেও বাস্তবায়ন করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, লেবাননে যুদ্ধ বজায় থাকলে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসতে আগ্রহী নয়। এটা আগেই জানিয়ে দিয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করা জরুরি হয়ে পড়ে। যদিও ট্রাম্প প্রকাশ্যে তা স্বীকার না করে বরং ইরানের ওপর চড়াও হয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ‘ট্রাম্প মূলত হুমকি দিয়ে ইরানকে দমন করতে চাইছেন। কিন্তু ইরান হুমকিকে পাত্তা দেয় না, এটা ট্রাম্পও বুঝেন।’
এই সংঘাতের পেছনে বৃহত্তর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। লেবাননের পরিস্থিতি অনেকটাই এই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অংশ। ফলে লেবাননে শান্তি প্রতিষ্ঠা অনেকাংশেই নির্ভর করছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনাও এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, চাইলে তিনি দ্রুত একটি চুক্তি করতে পারেন, তবে তিনি ‘স্থায়ী’ বা ‘দীর্ঘস্থায়ী’ সমাধান চান।
বর্তমান বাস্তবতা এমন, যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পমেয়াদি কোনো সমঝোতার বদলে এমন একটি চুক্তি চাইছে, যা ভবিষ্যতে আবার সংঘাতের ঝুঁকি কমাবে। তবে ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শর্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে, বিশেষ করে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়গুলোতে।
এদিকে সংঘাতকে ঘিরে বৈশ্বিক উদ্বেগও ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অনেকেই ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এটি অন্তত সাময়িকভাবে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কমাবে। তবে একই সঙ্গে সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে -যদি বৃহত্তর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের সমাধান না হয়, তাহলে এই যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এক ধরনের ‘অস্থির শান্তি’ তৈরি করেছে। বাইরে থেকে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল মনে হলেও ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা এখনো তীব্র।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কূটনীতি ও সামরিক শক্তির মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সময়ের চাপ ইরানের ওপর বাড়াতে চাইছে, আর ইরান চেষ্টা করছে নিজেদের অবস্থান শক্ত রেখে আলোচনায় যেতে।
আগামী দিনগুলোতে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে দুই পক্ষের সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার ওপর। তবে আপাতত একটি বিষয় পরিষ্কার -সময়ের হিসাব এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে, এবং সেই সময়ের ঘড়ি দ্রুতই টিকটিক করছে।

ইরানের পাল্টা জবাব
ট্রাম্প যখন ঘড়ির কাটা ধরে ইরানের সময় গুনছেন তখন ইরানি নেতারা পাল্টা জবাব দিয়েছেন এবং ‘জাতীয় স্বার্থ’ প্রাধান্য দিচ্ছেন। স্যোশাল মাধ্যমে ইরানের রাজনৈতিক নেতা, কূটনৈতিক এবং সামরিক বাহিনীর কমান্ডাররা ঐক্যবদ্ধভাবে এই প্রচারণা চালিয়েছেন। ঐক্যবদ্ধ ইরান প্রচারণা চালিয়ে মূলত ট্রাম্পের ‘ঘড়ির কাটা’র জবাব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ইরানি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রনায়কদের ঐক্য ও সংহতির বার্তাটির শিরোনাম ছিল ‘এক আল্লাহ, এক জাতি, এক নেতা এবং এক পথ; আর এটাই ইরানের বিজয়ের পথ, যা জীবনের চেয়েও প্রিয়।’ এই বার্তাটি মার্কিন-ইসরায়েলি শত্রুর উদ্দেশে এই বার্তাই দিয়েছে যে, আজকের ইরান কোনো অশুভ শক্তির কৃত্রিম মেরুকরণ থেকে অনেক দূরে।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ (ইসলামাবাদ আলোচনায় ইরানের আলোচক দলের প্রধান) এবং বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেন মোহসেনি এজেই হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে একযোগে একটি বার্তা জারি করেছেন।
এতে বলা হয়, ‘আমাদের ইরানে কোনো কট্টরপন্থী বা উদারপন্থী বলতে কিছু নেই; আমরা সবাই ‘ইরানি’ এবং ‘বিপ্লবী’ এবং জাতি ও সরকারের লৌহ কঠিন ঐক্য এবং বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে আমরা অপরাধী আগ্রাসনকারীকে অনুতপ্ত করব। এক আল্লাহ, এক নেতা, এক জাতি এবং এক পথ; এটাই ইরানের বিজয়ের পথ, যা জীবনের চেয়েও প্রিয়।’
-তথ্য সূত্র : আল জাজিরা এবং পার্সটুডে
-পতাকানিউজ

