চাঁদাবাজি, প্রতারণা, মাদক সংশ্লিষ্টতা ও হুমকি-ধমকিসহ এমন কোনো অভিযোগ বাকি নেই তার বিরুদ্ধে। এর আগে তিনি ছিলেন ওমরগণি এমইএস কলেজের ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী। কিন্তু ৫ আগস্টের পর নিজের খোলস পাল্টান। যোগ দেন যুব শক্তিতে। সদস্য হয়ে যোগ দিয়েই হয়ে উঠেন প্রভাবশালীদের একজন। তার ক্ষমতার দাপটে অসহায় হয়ে পড়েন এলাকার সাধারণ মানুষ। তার প্রতারণা থেকে বাদ যায়নি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে কলেজ ছাত্রীও। আর এসব করে তিনি এখন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। বলছি, চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুবশক্তির সংগঠক আফতাব মজুমদারের জয়ের কথা। তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় রয়েছে একাধিক ডায়েরিও। এরপরও তিনি সংগঠনের পদে বহাল রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি প্রকল্পের ইট-বালি সরবরাহের নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর ওপর প্রভাব খাটিয়ে প্রথমে চাঁদা দাবি এবং পরে নিজেই সাপ্লাইয়ের হয়ে যান। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বিভিন্ন সময় অসহায় মানুষদের ব্যাংক ঋণ পাইয়ে দেয়া বা বন্দর সংক্রান্ত কাজ করে দেয়ার প্রলোভনে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এমনকি ধার করা টাকা না দিয়ে পাওনাদেরকে উল্টো দেন হুমকি।
শুধু তাই নয়, টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করা বন্দর মহিলা কলেজের ছাত্রীদের পাশ করিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার নাম হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল পরিমাণ টাকা। পরবর্তীতে পরীক্ষা দিতে না পেরে তারা সেসব টাকা ফেরত চাইলে গণেশ উল্টে দেন এই নেতা। সেসব কথোপকথনের রেকর্ডসহ প্রমাণ রয়েছে পতাকানিউজের কাছে।
এ নিয়ে এক ভুক্তভোগী পতাকানিউজের কাছে লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি মাহমুদুর রহমান বাপ্পির খালাতো ভাই এনসিপি নেতা আফতাব মজুমদার জয়ের লাইসেন্সে ইস্ট কলোনি সিমেক গ্রুপের সাইডে ২১ লাখ ১৪ হাজার ৯০০ টাকার ইট ও বালু সাপ্লাই দিই। কোম্পানি থেকে বিলগুলো তার একাউন্টে দিলে সে ঐ বিল নিয়ে শুরুতে ঘুরানো শুরু করে। পরে একপর্যায়ে আমার ফোন কল ধরা বন্ধ করে দেয়। এরপর আমি বাপ্পীকে বিষয়টি জানাই। কারণ বাপ্পী আমাকে জয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।’
‘বাপ্পীকে বললে, সে বলে জয় আমার কথা শুনছে না, তুমি তোমার মত করে দেখ। আমি জয়ের বাবার কাছে গিয়েছি। উনি বলে ওনার কথা জয় শুনছে না। এটা নিয়ে ইস্ট কলোনিতে বিএনপি নেতা রুবেল ভাই, আরমান সখিদার, ওরে কল করে ডেকে নিয়ে আসে তখন সে সকলকে বলে কোম্পানির সব বিল ঢুকলে আমাকে টাকা দিয়ে দিব। কোম্পানির সব বিল ঢুকলেও সে আর কারোও কথা শুনে না, তার অনেক ক্ষমতা, সেই ক্ষমতার বল দেখিয়ে বলে সে আমার টাকা দিবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমি তার থেকে কিসের টাকা পাই। আমি তাকে হাত জোর করে রিকোয়েস্ট করেছি টাকার জন্য, পায়ে পরেছি তাও সে আমাকে টাকা দিবে না বলছে এবং সে আমাকে মামলার হুমকি দেয়। সে আরো বলে, আমাকে আওয়ামী লীগের কর্মী বলে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিবে। এই ঘটনা বন্দর থানা থেকে শুরু করে বন্দর এলাকার অনেক নেতা জানে। সে এনসিপি নেতা তাই কেউ সাহস করে না এই ব্যাপারে কথা বলতে। আমার যদি কোনো ক্ষতি হয় তার জন্য দায়ী মাহামদুর রহমান বাপ্পির খালাতো ভাই আফতাব মজুমদার জয়।’
লিখিত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কথা হয় অভিযোগকারী মো. রাকিবুল ইসলাম শিবলীর সঙ্গে। এই ঘটনায় কেন মামলা করেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি থানায় অভিযোগ করি। এরপর দুপক্ষকে ডেকে কথা বলেন থানার ওসি। উভয়পক্ষের কথা শোনার পর তিনি আসল সত্য জানতে পারেন। এরপর ওসি আমাকে টাকা দিয়ে দিতে বলেন। চলতি বছরের ৬ আগস্ট টাকা নিয়ে বসার কথা ছিল। তখন সে বসেনি। এরপর সে আমার নামে উকিল নোটিশ দেয়। এরপর আমি একজন আইনজীবীর সহায়তায় তার জবাব দিই। আমি যে চুক্তিতে আগে মাল দিতাম সেই অফিস থেকে কিছু ডকুমেন্টস সংগ্রহ করা বাকি। তাই মামলা করতে পারিনি।’
এদিকে রকিব উদ্দিন নামে আরও একজন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি আফতাবকে টাকা দিয়েছি সে ব্যবসা করবে বলে আমার থেকে ঋণ চায়। আমিও সরল মনে তাকে টাকা দিয়েছি। কিন্তু সে আমাকে এরপর আর টাকা দিচ্ছে না। বেশ কয়েকবার ঘুরাঘুরি করার পরও টাকা পায়নি। বিগত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে আমার ফোনও ধরে না উল্টো আমাকে বিভিন্ন হুমকি দিচ্ছে। একটি স্ট্যাম্পও আছে যেখানে তার স্বাক্ষর রয়েছে।’
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আফতাব মজুমদার জয়। তিনি বলেন, ‘রকিবুল ইসলাম আগে থেকে আমার পেছনে লেগেছিল। তাকে আমি আগে থেকে চিনতাম না। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ হয়েছে। আমি থানায় গিয়ে আমার সকল প্রমাণ উপস্থাপন করি। সে মূলত আমাকে হয়রানি করতে এসব করছে। তার সঙ্গে আমার কোনো চুক্তি নেই। আমার কোনো ওয়ার্ক অর্ডারও আমি তাকে দিইনি। আমি সরাসরি আদালতে অভিযোগ করেছি। সে হিসেবে তার কাছে উকিল নোটিশ গেছে। এরপর সে আমাকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করে। তাই আমি আমার মানহানির মামলা করার প্রক্রিয়া নিচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা আগে থেকে ব্যবসা করে আসছে। বন্দরের সুইমিংপুলের কাজটা সে একাই করেছে। এখন আমি যখন ব্যবসা শুরু করি তখন সব ভাগ হয়ে যাচ্ছে। সে এটা আর নিতে পারেনি।’
ছাত্রলীগ করার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘জুলাইতে আমার অনেক ভূমিকা ছিল। আমি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। একটা জন্মদিনকে কেন্দ্রকরে আমাকে চাপ প্রয়োগ করে অনেক কিছু করিয়েছে। আর তাছাড়া এখন যে ছবি দেখানো হচ্ছে তা অনেক আগের ছবি।’
৩ লাখ টাকা পাওনাদারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেই স্ট্যাম্পে আমি স্বাক্ষর করিনি। এটা পুরোটা ভুয়া। আমার স্বাক্ষর নকল করে এসব করা হয়েছে।’ এরপর তার কাছে আদালতে করার অভিযোগের কপি চাইলে তিনি পরে দিবেন বলে আর দেননি।
এ বিষয়ে যুবশক্তি চট্টগ্রাম মহানগরের আহ্বায়ক ইরফাত ইবরাহিম বলেন, ‘এই ধরনের অভিযোগ আমি আগেও শুনেছি। তবে সে কমিটিতে আসার আগের ঘটনা। পরবর্তীতে আমি উভয় পক্ষকে ডেকে কথা বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। বাদী ও বিবাদী কেউই আসেনি। তবে আমাদের কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ দেয় তাহলে আমরা সুষ্ঠু সমাধান দিবো।
পতাকানিউজ/এএস/আরবি

