বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এতে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনসহ উভয়পক্ষের অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর রাতে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর মধ্যরাত থেকে নিজেদের নিরাপত্তাহীনতার কথা তুলে ধরে চার দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির ডাক দিয়েছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। এতে হাসপাতালে আসা শত শত সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনেরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
অন্যদিকে, চিকিৎসকদের ওপর হামলার অভিযোগে চারজন স্থানীয় ছাত্রদল নেতাসহ রোগীর ছয় স্বজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে বগুড়া শহরের রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক অ্যাজমা জটিলতা নিয়ে শজিমেক হাসপাতালের সপ্তম তলার মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তবে স্বজনদের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে রোগীর স্বজন ও সঙ্গে আসা বহিরাগতরা উপস্থিত তিনজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের ওপর চড়াও হন।
এসময় আদনান ইসলাম অর্ক নামে এক ইন্টার্ন চিকিৎসক তাদের বাঁচাতে এগিয়ে এলে হামলাকারীরা তার ওপর চড়াও হন। পরে অন্যান্য ইন্টার্ন চিকিৎসক এগিয়ে এলে উভয়পক্ষ মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় তিন ঘণ্টা পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সেখান থেকে পুলিশ রোগীর আহত ছয় স্বজনকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়।
তবে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক ভুল ইনজেকশন দেওয়ায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে তাদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে গড়ায়।
স্বজনদের দাবি, পরে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা তাদের সঙ্গে থাকা ছয়জনকে মারধর করে হাসপাতালের ভেতরে আটকে রাখেন।
হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক রিতুল মণ্ডল স্নিগ্ধ জানান, বহিরাগতদের হামলায় তাদের অন্তত ছয়জন চিকিৎসক আহত হয়েছেন। নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু বিচার না পাওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করা হচ্ছে।
এদিকে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মনজুর-এ-মোর্শেদ।
তিনি বলেন, বহিরাগতদের হামলায় ইন্টার্ন ও মিড লেভেল মিলিয়ে ছয়জন চিকিৎসক জখম হয়েছেন। প্রশাসন ও জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক নেতারা পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা করছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, জ্যেষ্ঠ ও মিড লেভেলের চিকিৎসকদের দিয়ে চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছে।
অপরদিকে আজ দুপুরে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে কলেজ প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।

সংবাদ সম্মেলনে ডা. রিতুল মণ্ডল স্নিগ্ধ চার দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো হলো- হামলাকারী দুষ্কৃতকারীদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং মামলার দৃশ্যমান, দেশের প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে ‘আর্মড আনসার’ বা সমমানের কঠোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ, শয্যা সংখ্যার সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশের বেশি অতিরিক্ত রোগী ভর্তি না করা এবং প্রয়োজনীয় লোকবল বৃদ্ধি ছাড়া ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি বন্ধ করা এবং হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজন বা দর্শনার্থীর অবস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. রিতুল মণ্ডল স্নিগ্ধ ছাড়াও ডা. অর্পণ দত্ত, ডা. রিদোয়ান উদ্দিন, ডা. এ কে এম আহসান জারিফ এবং ডা. মেহেরুপ হোসেন পৃথিবী উপস্থিত ছিলেন। চিকিৎসক প্রতিনিধি ডা. জেরিন ও ডা. রিদোয়ান উদ্দিন জানান, হাসপাতালের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলমান থাকবে।
এদিকে আকস্মিক এ কর্মবিরতির কারণে ইনডোর ও আউটডোর সেবা ব্যাহত হওয়ায় সাধারণ রোগীরা দুর্ভোগে পড়েছেন।
চিকিৎসাধীন ঝরনা বেগম ও নিতাই নামের দুই রোগী জানান, ঘটনার পর থেকেই হাসপাতালে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ইন্টার্ন ডাক্তাররা সেবা বন্ধ রাখায় ও ফাইল নিয়মিত না দেখায় রোগীরা চরম শারীরিক ও মানসিক অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
এদিকে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় বগুড়া সদর থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলার পর আজ বিকেল সাড়ে ৪ টায় গ্রেপ্তার ছয় জনকে বগুড়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে, হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে ৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৮-১০ জনকে আসামি করে বগুড়া সদর থানায় মামলাটি করেন।
গ্রেপ্তাররা হলেন- বগুড়া সদর উপজেলার ফুলবাড়ী দক্ষিণপাড়া এলাকার মোঃ সাজুর ছেলে মো. নাফিউল (২৬), ফুলবাড়ী মধ্যপাড়া এলাকার মিজানুর রহমানের ছেলে প্রান্ত (২২), ফুলবাড়ী উত্তরপাড়া এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে এস এম সিহাব (১৯) ও সবুজ প্রামানিকের ছেলে রাকিবুল হাসান (১৯), নিশিন্দারা পূর্ব খাঁপাড়া এলাকার মো. জাকির হোসেনের ছেলে তানবিন শেখ (২৬) এবং নামাজগড় ভান্ডারী মসজিদ এলাকার লোকমান হাকিমের ছেলে বিপ্লব সরদার (২৬)।
এদের মধ্যে বগুড়া শহরের ১৮ নম্বর ওয়ার্ড মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক নাফিউল ইসলাম ও যুগ্ম আহ্বায়ক প্রান্তকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তাদের পরে পুলিশ হেফাজতে থানায় নেওয়া হয়। মামলার ১ নম্বর আসামি ফুলবাড়ী উত্তরপাড়া এলাকার মো. রনটির ছেলে মো. মনির (২৬) বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহীম আলী জানান, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেলে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইন্টার্ন ডাক্তার ও স্বজনদের মধ্যে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে ৪ জনকে এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন আরো ২ জনকে হেফাজতে নিয়ে আসা হয়।
ওসি আরও জানান, মামলার বাকি অজ্ঞাতনামা আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পতাকানিউজ/পিএম/আরবি

