হযরত শাহজাহান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো হাউজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তের শুরুতেই তদন্তকারীদের নাকে ‘নাশকতার গন্ধ’ লেগেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। নাশকতার গন্ধ শুঁকতে তদন্তকারীরা প্রাথমিক পর্যায়ের তদন্ত শুরু করলেও আগুনের সঠিক কারণ সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য পায়নি। ফলে তদন্তকারীরা অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ অনুসন্ধান করছেন।
তদন্তের শুরুতেই তদন্তকারী দল সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। অগ্নিকাণ্ডের আগের দিন এবং অগ্নিকাণ্ডের দিন যারা কর্মরত ছিলেন তাদের তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। এদের মধ্যে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
এতদিন বলা হচ্ছিল বিমানবন্দরটিতে বিশ্বমানের ফায়ার ইউনিট রয়েছে। তারপরও কেন এত বড় অগ্নিকাণ্ড সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হন্তদন্ত হচ্ছেন তদন্তকারীরা। নানা প্রশ্নের উত্তর পেতে পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। তদন্তকারীদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যাতে কার্গো ও বিমানবন্দরে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি এবং সেই ঘাটতিগুলো যথাযথভাবে পূরণ না হওয়ার কারণ কি ছিল তা যেন খুঁজে বের করা হয়।
রবিবার সারাদিন নানা কাজ হয়েছে অগ্নিকাণ্ড ঘিরে। সকালে বিমানবন্দর ঘুরে দেখা গেছে, তখনো ধোয়া উড়ছিল অগ্নিকাণ্ডস্থল থেকে। সেখানে বেবিচক নিয়ন্ত্রিত ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্ব এবং ৮ নম্বর গেট দিয়ে গাড়ি প্রবেশে বাধা প্রদানের কারণ খুঁজে বের করা হচ্ছে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ ও কার্গোয় থাকা দ্রব্যপত্রের তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া আগের সরকার ও বর্তমান কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকলে তা যাচাই করার নির্দেশ রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকতা পরিচয় প্রকাশ হবে না শর্তে জানিয়েছেন, বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ধরণ দেখে নাশকতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বা অন্য কোনো কারণে এই আগুন লাগার সম্ভাবনা কম।’

নাশকতার বিষয়টি মাথায় নিয়ে তদন্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য ও বেসামরিক বিমান পরিবহন উপদেষ্টা শেখ বশীরউদ্দীন। তিনি বলেছেন, ‘নাশকতা বা অন্য কোনো কারণকে উপেক্ষা করা হবে না। সবকিছু যাচাই করে তদন্ত চালানো হবে। ক্যাটালগিং কমিটি আগুনের পূর্ব এবং পরবর্তী অবস্থার বিস্তারিত তালিকা তৈরি করবে। গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিমানবন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই এলাকা, যেখানে আগুনের কারণে মানুষের প্রবেশ সীমিত ছিল।’
কার্গো হাউজে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় শনিবার রাত সাড়ে ৯টায়। তবে পরবর্তী দিন ধোঁয়া লক্ষ্য করা যায়। শনিবার সকালেও ফায়ার সার্ভিস উত্তর এবং দক্ষিণ থেকে পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করছিল।
অন্য একটি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিমানবন্দরে ২০০ জনবল নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। পরে সেটি বাতিল করেছিল সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ বাতিল করেছিল। ফলশ্রুতিতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ল দেশ। একই সঙ্গে আমদানি-রপ্তানির প্রচুর পরিমাণ পণ্য পুড়ে গেল।
বিমানবন্দরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের নির্দেশে সাধারণ যাত্রীদের সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং বাতিল ফ্লাইটের ক্ষতি কমাতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও মালিকদের কার্গো ভবনে প্রবেশ অনুমতি দেয়া হয়নি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় ডিটেকশন ব্যবস্থা থাকলে এত বড় দুর্ঘটনা হতো না। ভবিষ্যতে এই ধরনের ব্যবস্থা আবশ্যক। তবে এখন নতুন আগুনের আশঙ্কা নেই।
শনিবার দুপুরে আগুন লাগার পর নিয়ন্ত্রণে আনতে আনতে সময় যায় রাত সোয়া ৯টা পর্যন্ত। এই সময় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনীর স্পেশাল টিম ও আনসার সদস্যরা ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কাজ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিপুল সংখ্যক ডিএমপি ও বিজিবি সদস্য মোতায়েন ছিলেন। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পৃথকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
পতাকানিউজ

