চট্টগ্রামে নির্বাচনি মাঠে জামায়াতের একাধিক প্রার্থীর বিতর্কিত বক্তব্যে ছড়িয়েছে উত্তাপ। বিশেষ করে চট্টগ্রাম–১৫ (লোহাগাড়া–সাতকানিয়া আংশিক) আসনের প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর একের পর এক ‘বিতর্কিত’ বক্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে চলছে নানা আলোচনা–সমালোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন ভাইরাল হচ্ছে তার বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ। এতে কেউ পক্ষ সমর্থন করছেন, আবার কেউ করছেন সমালোচনা।
দুবারের সাবেক এমপি ও দীর্ঘমেয়াদি কারাবন্দি এই নেতার সাম্প্রতিক মন্তব্যকে অনেকেই ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উস্কানিমূলক’ বলে অভিহিত করেছেন। একটি বক্তব্যের জন্য তাকে শোকজ করেছে জামায়াত, আরেকটি বক্তব্যের জন্য তিনি নিজেই দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
এসব ঘটনার মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আরেকটি ভিডিও চট্টগ্রাম–১ (মিরসরাই) আসনের জামায়াত প্রার্থী ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুর রহমানের সঙ্গে থানার ওসির কথোপকথনের।
ভিডিওতে দেখা যায়, সাইফুর রহমান পুলিশ প্রশাসনকে ‘সহায়তা’ দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশের সাথে সহায়ক পুলিশ লাগলে শিবির–জামায়াতের লোক দিব। গোয়েন্দা লাগলে লোক ছাড় দেবো।’
ভিডিওটি ২০ নভেম্বর বিকেলে মিরসরাই থানা থেকে ধারণ করা হয়েছে। মিরসরাইয়ে ডাকাতির ঘটনা বন্ধের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ওসিকে এসব কথা বলেন জামায়াতের প্রার্থী।
ওসিকে সাইফুর রহমান বলেন, ‘মিরসরাইতে ক্রমবর্ধমান ডাকাতি চলছে, যদি আমরা দু-একটা ডাকাতকে স্ট্যান্ডবাই ধরতে পারতাম, শাস্তি দিতে পারতাম, কিছু একটা লোকজনের নজরে আনতে পারতাম, তখন হয়তো সবাই মনে করত অ্যাকশনমূলক কাজটা বেশি হচ্ছে।’
জবাবে ওসি আতিকুর রহমানক বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের আপনাদের সহযোগিতা দরকার। অন্তত ১৫টা দিন আপনারা আমাকে সহযোগিতা করেন, দেখেন কী রেজাল্ট আসে। আপনি যেটা প্রথমে প্রস্তাব দিয়েছেন, আমি এটাতে খুবই আনন্দিত এবং খুব খুশি হয়েছি। আপনাদের সমাজসেবী যারা আছেন, পাড়ায়-পাড়ায় মহল্লায়-মহল্লায় টিম করে দেন, আমরা একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ করি, আমার পুলিশের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। আমি সরাসরি যুক্ত থাকব। মাঠে তাদের তদারকি করব, তাদের সেফটি আমি দেব।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘প্রশাসনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে শাহজাহান চৌধুরীর যে বক্তব্য গত সপ্তাহে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল, মিরসরাইয়ের এ অডিও যেন তারই বাস্তব রূপ দেখাচ্ছে।’
স্থানীয়দের মতে, শাহজাহান চৌধুরীর হুঁশিয়ারির জেরেই হয়ত এমন মনোভাব তৈরি হয়েছে নেতাকর্মীদের মাঝে।
সম্প্রতি সাতকানিয়ার চরতি ইউনিয়নের তুলাতুলি বাজারে গণসংযোগে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘খবরদার, খবরদার; আমি শাহজাহান চৌধুরী। আমাকে যারা চেনে না, তারা এখনো মাটির নিচে থাকে… আল্লাহ আমার জন্য সূর্য ঠেকিয়ে রাখবেন।
আরেকটি ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস তাকে ‘গার্ডিয়ান অব চিটাগং’ বলেছেন।’
এর আগে গত ২২ নভেম্বর চট্টগ্রাম মহানগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারের সভায় প্রশাসনকে নিজের ‘আন্ডারে’ আনার কথা বলেন তিনি। সভায় তিনি বলেন, ‘প্রশাসনে যারা আছে, তাদের আমাদের কথায় উঠতে–বসতে হবে, গ্রেপ্তার–মামলাও আমাদের কথায় হবে।’
এ বক্তব্যের প্রতিবাদে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বিবৃতি দেয়। পরে জামায়াত তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠায়।
৬ মে নগর জামায়াতের এক সভায় শাহজাহান চৌধুরী চট্টগ্রামের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা নিয়েও ব্যাপক বিরোধ সৃষ্টি হয়।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও মাইজভান্ডার দরবার এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানালে তিনি সামাজিক মাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বলেন, ভু‘ল তথ্যের ভিত্তিতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন।’
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, ‘এসব মন্তব্য দলের আদর্শ ও শৃঙ্খলার পরিপন্থী। শোকজের জবাবে সন্তুষ্ট না হলে শাহজাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।’
দলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে এমন বক্তব্য পুরো সংগঠনকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।’
ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত, রাজনৈতিক হুমকি এবং নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে নির্বাচনী পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘একদিন শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্য ভাইরাল হয়, আর পরে মিরসরাইয়ে তার প্রতিফলন দেখা যায়। এটি নির্বাচনি পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।’
পতাকানিউজ/এএস/আরবি

