চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সাবেক আমির শাহজাহান চৌধুরীর একের পর এক মন্তব্যে দলের ভেতর অস্বস্তি বাড়ছে। তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে দলটি। তাতে ব্যবহৃত ভাষাও ছিল বেশ কঠোর। পাশাপাশি, তার এসব বক্তব্য কার হাত ধরে মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে সেটাও ভাবিয়ে তুলছে দায়িত্বশীলদের।
জামায়াতে একসময় সাংগঠনিক কঠোরতার দৃষ্টান্ত থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ছক কিছুটা ঢিলেঢালা হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। এদিকে ‘দলে গ্রুপিং নেই’ এমন দাবি দীর্ঘদিনের হলেও শাহজাহান চৌধুরী ইস্যু সেই অবস্থানকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এরমধ্যে শাহজাহান চৌধুরীর একের পর এক বক্তব্য ভাইরাল সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিষয়ে সর্ববৃহৎ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন জিইসি কনভেনশন হলের বক্তব্যকে ঘিরে। কারণ হিসেবে বলছেন এই প্রোগ্রাম থেকে বক্তব্য বের হওয়া মানে ভেতরের কেউ। তৃণমূলের বেশ কিছু নেতা স্বীকার করছেন দলে মতপার্থক্য এখন স্পষ্ট।
নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলটির ভেতরে দু’টি ভিন্নমতের অবস্থান গড়ে উঠেছে। নগর জামায়াতের এক দায়িত্বশীল নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘দলে গ্রুপিং আছে। কেন্দ্রীয় একজন নেতার সঙ্গে শাহজাহান চৌধুরীর বিরোধ নতুন নয়। কেন্দ্রের ওই নেতার অনুসারী বেশি হওয়ায় শাহজাহান চৌধুরী কিছুটা চাপের মুখে আছেন।’
ওয়ার্ড পর্যায়ের আরেক নেতা অবশ্য এটিকে গ্রুপিং বলতে নারাজ। তাঁর ভাষায়, ‘নিয়মনীতিমুখী নেতৃত্ব আর মাঠ রাজনীতি কেন্দ্রিক নেতৃত্বের মধ্যে ভাবনার পার্থক্য আছে। এটাকে গ্রুপিং বলা ঠিক নয়।’
শাহজাহান চৌধুরীর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘উনি অভিজ্ঞ নেতা। কিন্তু উনাকে সংযত হতে হবে। জামায়াত ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল নয়। এভাবে চলতে থাকলে দল ছাড় দেবে না।’
গত বছর মেয়াদের মাঝপথে তাকে মহানগর আমিরের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া নিয়েও দলটির ভেতরে প্রশ্ন উঠেছিল। তখন বলা হয়েছিল এ সিদ্ধান্ত শাস্তিমূলক নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা ব্যবহার করতেই তাঁকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মনোনিবেশ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ ২৪ নভেম্বর পাঠানো কারণ দর্শানোর নোটিশে দল স্পষ্ট জানায় তিনি আগেও বেশ কয়েকবার শৃঙ্খলাবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মুহাম্মদ নুরুল আমিন কথা বলতে রাজি হননি। তাঁর বক্তব্য, ‘এটি এখন কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়।’
শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের বাইরে আছেন এবং কেন্দ্রীয়ভাবে তাঁকে আপাতত গণমাধ্যম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
গত শনিবার নগরের জিইসি কনভেনশন হলে জামায়াত আয়োজিত নির্বাচনী দায়িত্বশীল সমাবেশে প্রশাসনকে নিয়ে তাঁর বক্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সেখানে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন শুধু জনগণ দিয়ে নয়- প্রশাসনের সবাইকে আমাদের আন্ডারে আনতে হবে। পুলিশকে আমাদের কথায় চলতে হবে।’
এর পরই তাকে সাত দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পেলে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানানো হয়েছে। এদিকে এর মধ্যেই আরেকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এক মিনিট ৪০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘খবরদার, আমি শাহজাহান চৌধুরী। আমাকে যারা চেনে না, তারা এখনো মাটির নিচে থাকে। আল্লাহর মেহেরবানি, সূর্য আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে।’
শাহজাহান চৌধুরীর এসব বক্তব্যে দলের ভেতর অস্বস্তি তুঙ্গে। একই সঙ্গে প্রকাশ পাচ্ছে দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকা মতানৈক্যের রেশ।
পতাকানিউজ/এএস/কেএস

