চট্টগ্রামে এক সময় শীর্ষ সন্ত্রাসী বলে তাদের অবহিত করা হতো, তাদের সঙ্গে কোনো মিল নেই। অনেকটা বাংলা সিনেমার ‘খলনায়কের’ মতো কর্মকান্ড করে আলোচনায় আসা এক সন্ত্রাসীকে নিয়ে এখন দেশব্যাপী চলছে আলোচনা। অথচ, পেছনের সারির এই সন্ত্রাসী এখন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীর’ তকমা পাচ্ছে অতীতের প্রকৃত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অবস্থান হারানোর কারণে।
-এমনই একজন সন্ত্রাসীর নাম ডেবিট ইমন। চাঁদাবাজি করতে করতেই যার উত্থান। অবশ্য অস্ত্রবাজি এবং হত্যা কান্ডেও তার নাম উঠেছে বেশ আগেই। ইমনের বিরুদ্ধে হত্যা ও অস্ত্রবাজি ছাড়াও মুল অভিযোগ, ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা। এসব করে অল্প সময়েই চট্টগ্রামের অপরাধজগতে আলোচিত নাম হয়ে ওঠেন মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন।
মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তাঁর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন তিনি। গত মঙ্গলবার রাতে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) নাজিমুল হক পতাকানিউজকে বলেন, ‘সন্ত্রাসী ইমন চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢোকেন। পুলিশের অভিযানের তথ্য পেয়ে তিনি আবার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এরই মধ্যে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইমন প্রায়ই সীমান্ত দিয়ে আসা-যাওয়া করেন। আমাদের কাছে তথ্য আছে, তাঁর কাছে দুটি দেশি-বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে।’
ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন থেকে অপরাধজগতে
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা ইমন দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড়। তাঁর বাবা মো. মুসা ওমানপ্রবাসী ছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, স্কুলজীবন থেকেই ক্রিকেটের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল ইমনের। কাঞ্চননগর থেকে সাইকেলে করে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে অনুশীলনে যেতেন। পরে চট্টগ্রাম মহানগরের অক্সিজেন এলাকায় খালার বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নেন। খেলতেন চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে। অনুশীলন করতেন কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে।
চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমির সাবেক কোচ আমিনুল হক বলেন, ‘ইমন খুবই ভালো ক্রিকেট খেলত। বাঁহাতি লেগ স্পিনার (চায়নাম্যান) হিসেবে তার ভালো পরিচিতি ছিল। ব্যাটিংও ভালো করত। জাতীয় দলের খেলোয়াড় কিংবা বিদেশি দলের খেলোয়াড়েরা চট্টগ্রামে এলে নেট অনুশীলনে ইমন বল করত। তার ভালো সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই খেলা থেকে উধাও হয়ে যায়। ২০২০ সালের পর তাকে আর দেখা যায়নি।’
যেভাবে অপরাধের পথে
পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরের রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর কলেজে ভর্তি হলেও এইচএসসি পরীক্ষা দেননি ইমন। ২০২০ সালে করোনার পর তিনি পুরোপুরি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তৈয়বের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
২০২২ সালে ওমানে যান ইমন। বছরখানেক পর দেশে ফেরেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান তিনি। পরে নগরের বায়েজীদ বোস্তামী এলাকার আতুরার ডিপো এলাকায় অবস্থান শুরু করেন। সেখানেই শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।
পুলিশের ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর নগরের অক্সিজেন এলাকায় ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে ইমনের সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের নজরে আনে।

একের পর এক হত্যা মামলার আসামি
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, হাটহাজারীতে জোড়া খুন, চান্দগাঁওয়ে আফতাব হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে মোট ১৫টি মামলা হয়েছে।
৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া ১৫ থেকে ২০টি অস্ত্র হাতে ইমনের একটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ বলছে, অস্ত্র ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় মোটরসাইকেল ভাড়া করা এবং সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ের দায়িত্বও ছিল তাঁর।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বায়েজীদ থানার একটি দস্যুতার মামলায় কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইমন। তবে গ্রেপ্তারের মাত্র ২২ দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি পান। এরপর তাঁর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ফোনের ওপাশের আতঙ্ক
পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বর্তমানে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন ইমন। অপরজন মোহাম্মদ রায়হান।
পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করতে বিদেশি নম্বর থেকে সবচেয়ে বেশি ফোন করতেন ইমন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে নগরের বায়েজীদ বোস্তামী থানা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজ উদ্দিনকে ফোন করে তিনি বলেন, ‘৫০ হাজার পুলিশ নিয়ে থাকলেও ঘরে গিয়ে মেরে ফেলব। তোর ভাইকে যেমন ১০ হাজার মানুষের মাঝখানে গুলি করে মেরেছি।’
এ ছাড়া ‘এমনভাবে গুলি করা হবে যে পরিবারের লোকজন গণনাও করতে পারবে না’ কিংবা ‘গুলি করে পুরো শরীর ভোমরার বাসা করে দেওয়া হবে’-এ ধরনের হুমকি দিয়ে বিদেশি নম্বর থেকে চাঁদা দাবি করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
গত ১৩ জুলাই নগরের বাকলিয়া অ্যাকসেস রোড এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ ওঠে ইমনের সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এর দুই দিন আগে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। নিজেকে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে এককালীন দুই কোটি টাকা দেবেন। মাসে দেবেন ১০ লাখ। এখন থেকে ব্যবসা আমরা করব।’
এরই মধ্যে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে ইমন দাবি করেন, ‘ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হব, না হয় বড়লোক হব। এখন বড়লোক হওয়ার জন্য এই পথে আছি।’
-পতাকানিউজ

