বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান শুল্ক বাধা কেটে যাওয়ায় দেশের রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক ছাড়ের সুবিধা কার্যকর হয়েছে। এটি দেশীয় পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, যা রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃঢ় করবে।
গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুই দেশের মধ্যে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড (এআরটি)’ স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপর প্রাথমিকভাবে আরোপিত পাল্টা শুল্কের হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি বাংলাদেশি পোশাক পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক ছাড় পাওয়া যাবে, ফলে মূলত পাল্টা শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে। এই পদক্ষেপ দুই দেশের অর্থনীতির জন্য সুখকর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য একক বৃহত্তম বাজার। বাংলাদেশ যে পোশাক রপ্তানি করে, তার প্রায় ১৯ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে যায়। এ কারণে এই নতুন শুল্ক সুবিধা দেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দি অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ছিল ৬ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। মোট আমদানিকৃত পোশাকের মধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার তুলাভিত্তিক এবং অবশিষ্ট অংশ নন-কটন বা তুলাবহির্ভূত পণ্য।
বাংলাদেশ ২০২৫ সালে মোট প্রায় ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করে সেই তুলা দিয়ে পোশাক উৎপাদন করলে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ এ ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক ছাড় প্রয়োগ হলে শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য খরচ কমানো এবং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
নন-কটন পণ্যের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ নন-কটন পণ্য। সুতরাং এই খাতেও রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক ফয়সাল সামাদ গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, নতুন পারস্পরিক শুল্ক ব্যবস্থা দেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও ম্যানমেড ফাইবার ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা ফাইবার ব্যবহার করে তৈরি কাপড় থেকে উৎপাদিত পোশাক রপ্তানি করা হলে শুল্ক কমানো বা শূন্যে নামানোর সুবিধা পাওয়া সম্ভব হবে। এটি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ফয়সাল সামাদ আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা উন্নত মানের হিসেবে পরিচিত। এই তুলা ব্যবহার করে দেশের স্পিনিং মিলগুলো উচ্চমানের সুতা উৎপাদন করতে পারবে।
যদিও ব্রাজিল, ভারত বা উজবেকিস্তানের তুলার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলার দাম কিছুটা বেশি, তবে শুল্ক সুবিধা ও উন্নত মানের সুতা মিলিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় সমন্বয় করা সম্ভব। স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো যদি প্রতিযোগিতামূলক দামে মানসম্মত সুতা সরবরাহ করতে পারে, তাহলে পোশাক রপ্তানিকারকরা এটি শক্তিশালী বিপণন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। ফলে উচ্চমূল্যের অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর সাবেক পরিচালক প্রকৌশলী রাজীব হায়দার বলেন, নতুন পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে সুতা ও পোশাক তৈরি করলে অতিরিক্ত শুল্ক ছাড় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এটি বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত সুতা ও পোশাকে শুল্ক ছাড় কার্যকর হলে রপ্তানিকারকরা খরচ কমাতে পারবেন, ফলে বাংলাদেশি পোশাক আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
তবে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা তুলনামূলক কম আমদানি করে। এর প্রধান কারণ হলো পরিবহন সময় বেশি এবং দাম কিছুটা প্রিমিয়াম পর্যায়ের। নতুন শুল্ক সুবিধা বাস্তবায়িত হলে উদ্যোক্তারা কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানির বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে বাজার সুবিধা ও শুল্ক সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এটি বাংলাদেশের স্পিনিং ও গার্মেন্টস খাতের জন্য লাভজনক হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “আগের অবস্থানের তুলনায় বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে লাভবান হবে। চুক্তির মাধ্যমে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, শ্রমিক অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের শর্তগুলো কার্যকরভাবে মানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু আন্তর্জাতিক চাপের কারণে নয়, দেশের স্বার্থে প্রয়োগ করা উচিত। শ্রমিক অধিকার রক্ষা, পরিবেশের মান নিশ্চিত এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মার্কিন ও ইউরোপীয় বাজারে সুবিধা পাওয়া সম্ভব হবে।
আউটপেস স্পিনিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার বলেন, সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, লজিস্টিক ব্যয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রয় চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নীতিগত স্থায়িত্ব ও স্পষ্ট বাস্তবায়ন কাঠামো নিশ্চিত করা হলে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্প উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হবে।
বিজিএমইএ জানিয়েছে, মার্কিন তুলা গুণগতভাবে উন্নত এবং ব্যয়বহুল হওয়ায়, স্থানীয় স্পিনাররা যদি প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করতে পারেন, তবে রপ্তানিতে বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হবে। নতুন বাণিজ্য চুক্তির ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রবেশাধিকারে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
-পতাকানিউজ

