অন্ধকার ভোরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগমনী টার্মিনাল দিয়ে বেরিয়ে আসছিলেন একের পর এক ক্লান্ত, অবসন্ন মুখ। বিশেষ সামরিক ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরলেন আরও ৩৯ জন বাংলাদেশি। তাদের চোখে ঘুম নেই, আছে শুধু হতাশা, ক্ষয় আর অনিশ্চয়তা। শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর ভোর ৫টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চিত্র ছিল এমনই।
ফিরে আসাদের প্রায় সবাই স্বপ্ন দেখেছিলেন একদিন পরিবারকে স্বচ্ছল জীবনের নিশ্চয়তা দেবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৩০–৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করে ফিরে আসতে হলো শূন্য হাতে, কেউ কেউ আরও বেশি ঋণের বোঝা নিয়ে।
এমন মানবিক বিপর্যয়ের পেছনে রয়েছে প্রতারণা, অব্যবস্থাপনা, আর অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন ব্যবস্থার ফাঁকফোকর। ফেরত আসা ৩৯ জনের মধ্যে ৩৪ জনই জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ বুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে বৈধ কাগজে ব্রাজিল গিয়েছিলেন। সেখান থেকে মানবপাচার চক্রের সহায়তায় মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশ করেন। অন্য পাঁচজনের মধ্যে দুজন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন আর তিনজন দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান। বৈধ ভিসায় যাত্রা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান হয়ে ওঠে অবৈধ প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার পথে পড়ে মানবপাচারের জালে।
ফেরত আসা এসব কর্মীদের মধ্যে ২৬ জনই নোয়াখালীর। এছাড়া কুমিল্লা সিলেট, ফেনী, ও লক্ষ্মীপুরের দুজন এবং চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ এবং নরসিংদীর একজন রয়েছেন। এর আগে চলতি বছরে ১৮৭ বাংলাদেশি ফেরত পাঠায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। গত দুবছরে এই সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২২০ জন।
ফেরত আসাদের কয়েকজন জানান, বছরের শুরুর দিকে যেসব বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, তাদের অনেকেরই হাতকড়া ও পায়ে শেকল পরানো ছিল। তবে আজ ফিরিয়ে আনা ৩৯ জনকে ওই ধরনের আচরণ করা হয়নি।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, ‘সরকার ব্রাজিলে বৈধভাবে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দিল কিন্তু সেখান থেকে কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রগামী হয়ে যাচ্ছেন, এটি সরকার বা এজেন্সি কেউই কি খেয়াল করেছে? একেকজন ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা খরচ করে ফিরে আসছে শূন্য হাতে এর দায় কি শুধু কর্মীদের?’
তিনি আরও বলেন, ‘যে এজেন্সিগুলো পাঠিয়েছে, যারা এই অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ছিল তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কয়েক হাজার কর্মী এভাবে ব্রাজিল গিয়েছে। নতুন করে অনুমতি দেয়ার আগে সরকারকে সতর্ক হতে হবে।’
দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও কঠোর করেছেন। দ্রুত শুনানি, দ্রুত রায় এবং চার্টার্ড বা সামরিক ফ্লাইটে ফেরত পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে।
মার্কিন আইন অনুযায়ী, বৈধ কাগজ ছাড়া থাকা কাউকে আদালতের রায় বা প্রশাসনিক আদেশে ফেরত পাঠানো যায়। আশ্রয়ের আবেদন ব্যর্থ হলে আইসিই তাৎক্ষণিকভাবে রিমুভাল কার্যক্রম পরিচালনা করে। এমন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশসহ দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলোর অভিবাসীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ব্রাজিলের সহজ ভিসা, উন্নয়ন প্রকল্পে শ্রমিকের চাহিদা এবং ল্যাটিন আমেরিকা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ‘শর্টকাট রুট’ এই তিন কারণেই ব্রাজিল অভিবাসী প্রার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে কাজের নিশ্চয়তা নেই। দালালেরা সীমান্ত পার করানোর নামে বিপজ্জনক পথ বেছে নেয়। ধরা পড়লে বছরের পর বছর ডিটেনশন সেন্টারে আটকে থাকতে হয়। এতে লক্ষাধিক টাকা খরচ করে পরিবারগুলো আরও অসহায় হয়ে পড়ে।
পতাকানিউজ/আরএস/আরবি

