রিকশার বিশৃঙ্খলাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজধানীতে ই-রিকশা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশবান্ধব ও শৃঙ্খলাপূর্ণ গণপরিবহন তৈরি। কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অন্য চিত্র প্রতিষ্ঠান বাছাই থেকে শুরু করে কারিগরি পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া জড়িয়ে পড়েছে অস্বচ্ছতা, পক্ষপাতিত্ব আর প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তে।
সরকারি কাজের নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠান আহ্বান করার কথা। সাধারণত জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। কিন্তু ই-রিকশা তৈরির ক্ষেত্রে তা হয়নি। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিজেরা কিছু প্রতিষ্ঠানকে ডেকে সরাসরি বাছাই করেছে। অভিযোগ উঠেছে, এখানে স্বজনপ্রীতি আর গোপন সমঝোতার প্রভাব কাজ করেছে।
প্রাথমিকভাবে আকিজ মোটরস, মনির অটো ইঞ্জিনিয়ারিং ও নিউ গ্রামীণ মোটরস বুয়েটের ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ই-রিকশা তৈরি করে কারিগরি কমিটির সামনে উপস্থাপন করে। অথচ ডাইস্টার হাইটেক পাওয়ার কোনো রিকশা উপস্থাপনই করেনি। তবুও ১৮ আগস্টের সভায় ডাইস্টারকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। একই সভায় অন্য তিন প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে ১০ দিনের মধ্যে সংশোধিত রিকশা বানিয়ে আনতে বলা হলেও ডাইস্টারকে ছাড় দেওয়া হয়।
গ্রামীণ মোটরস ও মনির অটো অভিযোগ করেছে, তারা সব নির্দেশনা মেনে কাজ করলেও কোনো কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রশ্ন—ডাইস্টার অংশ না নিয়েও কেন বিবেচিত হলো, আর আকিজকে কেন বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলো?
একাধিক সদস্য স্বীকার করেছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিয়ম লঙ্ঘন হয়েছে। একজন সদস্যের ভাষায়, ডাইস্টারের রিকশা আদৌ দেখানো হয়নি, তবু অনুমোদিত হিসেবে ধরা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ভালো উদ্যোগটাই ভেস্তে যাবে।
ডাইস্টারের কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তারা বুয়েটের ডিজাইন মেনে রিকশা তৈরি করেছেন এবং কার্যাদেশও পেয়েছেন। আকিজ মোটরসও বলছে, কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছে, সংশোধনীও এনেছে, আর সরকার প্রথম ধাপে তাদের মাধ্যমে এক লাখ ই-রিকশা বানানোর পরিকল্পনা করছে।
নিউ গ্রামীণ মোটরস ও মনির অটো অভিযোগ করছে, একই অবস্থায় থেকেও আকিজকে এগিয়ে রাখা হয়েছে রহস্যজনক কারণে। মনির অটোর মালিক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ডাইস্টার না থেকেও কীভাবে চূড়ান্ত হলো? আকিজের জন্য যে নিয়ম, অন্যদের ক্ষেত্রেও তো একই হওয়া উচিত ছিল।’
ডিএনসিসির পরিবহন মহাব্যবস্থাপক শওকত ওসমান স্বীকার করেছেন, জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি, শুধু ফেসবুকে দেওয়া হতে পারে। তিনি বলেছেন, নীতিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি, ভুলত্রুটি সংশোধনের সুযোগ আছে। ডিএসসিসির মহাব্যবস্থাপক নাছিম আহমেদও বলেছেন, ডাইস্টার কীভাবে চূড়ান্ত হলো তিনি জানেন না। তবে মন্ত্রণালয় ও কমিটির আরও সভা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল রাজধানীর রিকশা শৃঙ্খলায় প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান আনা। কিন্তু বাছাই প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা ও পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তে এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দ্রুত স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে ‘শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ’ পরিণত হবে আরেকটি অদৃশ্য স্বার্থান্বেষী চক্রের খেলায়।
পতাকানিউজ/এনটি

