সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে ২০৪৩ সাল পর্যন্ত মনোনয়নভিত্তিক ৫০টি সংরক্ষিত আসন বজায় রাখার সিদ্ধান্তে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি। ৬৭টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত এই প্ল্যাটফর্ম এক বিবৃতিতে জানায়, প্রস্তাবটি তারা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।
মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ড. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বিষয়ে দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবিকে উপেক্ষা করে সকল রাজনৈতিক দলের এমন পশ্চাৎপদ সিদ্ধান্তে একমত হওয়া হতাশাজনক ও বিস্ময়কর।’
৩১ জুলাই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের ১৯টি প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছালেও ১০টিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ এসেছে। নারীদের আসন বৃদ্ধির প্রসঙ্গে সর্বাধিক আপত্তি এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সমতা ও গণতন্ত্রভিত্তিক সমাজ গড়ার আন্দোলনে নারীদের দীর্ঘ প্রচেষ্টা উপেক্ষিত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এ ধরনের ‘পশ্চাৎপদ’ অবস্থানকে কমিটি ‘গভীর বিস্ময়’ হিসেবে দেখছে।
সংবিধান সংস্কার কমিশন সরাসরি ভোটে ১০০ নারী আসনের প্রস্তাব দেয়, যা নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের সুপারিশ করে। একই প্রস্তাব দেয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অন্যদিকে, সিপিবি, বাসদ ও জেএসডি সরাসরি ভোটের দাবি তোলে।
জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলো আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে ১০০ নারী আসন চায়। বিএনপি ও তাদের সহযোগী দলগুলো বিদ্যমান পদ্ধতিতে ১০০ সংরক্ষিত আসন রাখার প্রস্তাব দেয়।
১৪ জুলাই কমিশনের সংশোধিত প্রস্তাবে বলা হয়, কোনো রাজনৈতিক দল ২৫টির বেশি আসনে প্রার্থী দিলে ন্যূনতম এক-তৃতীয়াংশ নারী হতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ দলই এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে।
এরপর ২৭ জুলাই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দীন আহমেদ বিদ্যমান ৫০ সংরক্ষিত আসন বহাল রাখার পাশাপাশি ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী করার প্রস্তাব দেন, যা পরবর্তী নির্বাচনে বাস্তবায়নের কথা বলেন। চতুর্দশ সংসদে এই হার ১০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাবও দেন তিনি।
৩০ জুলাই কমিশনের নতুন প্রস্তাবে ধাপে ধাপে নারী প্রতিনিধিত্ব ১০০ আসনে উন্নীত করার রূপরেখা দেওয়া হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫(৩) সংশোধন করে বিদ্যমান ৫০টি সংরক্ষিত আসন বহাল থাকবে। পাশাপাশি আগামী সাধারণ নির্বাচনে প্রতিটি দল ৭ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে এবং চতুর্দশ নির্বাচনে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত হবে। পরবর্তী প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনে এই হার ৫ শতাংশ করে বাড়িয়ে পঞ্চদশ সংসদে সরাসরি নির্বাচিত ১০০ নারী সদস্য নিশ্চিত করা হবে।
বিবৃতিতে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি বলেছে, বাংলাদেশের নারীরা এখন সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে সমান মর্যাদা ও কার্যকর ভূমিকা পালনে সক্ষম। এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হবে এবং নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বিস্তৃত ও অর্থবহ হবে।
তাদের প্রস্তাবে বলা হয়, জাতীয় সংসদের ৩০০টি সাধারণ আসনে নারী-পুরুষ উভয়ের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। অতিরিক্ত ১৫০টি নারী আসন রাখতে হবে, যা নির্দিষ্ট এলাকায় সরাসরি ভোটে পূরণ করা হবে। মনোনয়নপ্রথা বাতিল করতে হবে এবং এ ব্যবস্থা অন্তত দুই থেকে তিন মেয়াদ চালু রাখতে হবে।
কমিটি রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে, ২০৪৩ সাল পর্যন্ত মনোনয়নভিত্তিক ৫০ আসন বহাল রাখার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে। একই সঙ্গে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সব রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
পতাকানিউজ/এনটি

