চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায় পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থাকা এক শিল্পপতির বাসা লক্ষ্য করে আবারও গুলি চালিয়েছে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসভবনে এই হামলার ঘটনা ঘটে। মোস্তাফিজু রহমান হলেন বাঁশখালী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের ভাই।
এ ঘটনায় এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে বাসাটি আগে থেকেই পুলিশি পাহারায় থাকার কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের অভিযোগ, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারীরাই চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে এই হামলা চালিয়েছে। তাঁর দাবি, বিপুল অঙ্কের চাঁদা না দেওয়ায় ধারাবাহিকভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল এবং সর্বশেষ হামলাটি সেই চাপেরই অংশ।
মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ভোরে নামাজ শেষ করে পরিবারের সদস্যরা বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই বাসার পেছন দিক থেকে হঠাৎ গুলির শব্দ শোনা যায়। মুখোশধারী কয়েকজন অস্ত্রধারী বাসাটিকে লক্ষ্য করে একাধিক রাউন্ড গুলি ছোড়ে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা অন্তত ছয় থেকে সাত রাউন্ড গুলি চালায়। নিরাপত্তাকর্মীরা বিষয়টি দ্রুত বাসার নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের জানালে তারা অবস্থান নেয়, তবে এর আগেই হামলাকারীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। হামলাকারীদের হাতে পিস্তল ছাড়াও চায়নিজ রাইফেলসহ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
এটি প্রথম ঘটনা নয়। গত ২ জানুয়ারি একই বাসায় গুলি চালানো হয়েছিল। সে সময় জানালার কাচ ভেঙে যায় এবং দরজায় গুলির চিহ্ন পড়ে। ওই ঘটনার পর থেকেই বাড়িটি পুলিশি পাহারায় ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও ফের হামলার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ব্যবসায়ীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সাজ্জাদ আলী তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করে আসছেন। শুরুতে ১০ কোটি টাকা এবং পরে পাঁচ কোটি টাকা দাবি করা হয়। দাবি না মানায় ধারাবাহিক হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। প্রায় ২০ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো একটি বার্তায় লেখা ছিল—‘ওয়েট অ্যান্ড সি’, যা তিনি নতুন হামলার পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।
মামলা করবেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, পুলিশি উপস্থিতির মধ্যেই যখন হামলা ঘটে, তখন মামলা করে কতটা ফল পাওয়া যাবে তা নিয়ে তাঁর সন্দেহ রয়েছে।
সিসিটিভিতে অস্ত্রধারী
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানিয়েছে, চারজন মুখোশধারী হামলায় অংশ নেয়। ফুটেজে দেখা যায়, তারা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বাসার সামনে এসে অবস্থান নেয় এবং লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
পুলিশের প্রাথমিক বিশ্লেষণে জানা গেছে, হামলাকারীদের একজন দুই হাতে দুটি পিস্তল ব্যবহার করছিল। অন্যদের কাছে ছিল সাবমেশিনগান (এসএমজি), চায়নিজ রাইফেল ও শটগান। পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা এলাকা ত্যাগ করে।
খবর পেয়ে নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন কবির ভূঁইয়ার নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তিনি জানান, হামলাকারীরা একটি প্রাইভেট কার ও একটি মোটরসাইকেলে করে এলাকায় আসে। গাড়ি কিছু দূরে রেখে হেঁটে বাসার কাছে গিয়ে গুলি চালানো হয়।
পুলিশের ধারণা, চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেই এই হামলা হয়েছে এবং বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী তাঁর সহযোগীদের দিয়ে ঘটনাটি ঘটিয়ে থাকতে পারেন। হামলাকারীরা মুখোশ পরায় শনাক্ত করতে সময় লাগছে, তবে সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মো. রায়হান ও বোরহানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্ত চলছে। তাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
স্মার্ট গ্রুপ দেশের একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। মোস্তাফিজুর রহমানের ছোট ভাই মুজিবুর রহমান ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের বাঁশখালী আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। জানুয়ারির হামলার পরও পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিল, যদিও তখন কোনো মামলা হয়নি।
হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে সাজ্জাদ আলী হামলার দায় অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, কে গুলি করেছে তা তাঁর জানা নেই। তবে একই সঙ্গে অতীতের একটি শিল্প দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে বিতর্কিত মন্তব্যও করেন।
অপরাধজগতে সাজ্জাদের উত্থান
চট্টগ্রামের চালিতাতলী এলাকার ঠিকাদার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী খান ১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান হত্যা মামলার পর আলোচনায় আসেন। সাক্ষীর অভাবে খালাস পেলেও এরপর থেকেই নগরের অপরাধজগতে তাঁর প্রভাব বিস্তার শুরু হয়।
২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ছয় কর্মীসহ আটজন নিহত হওয়ার ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। পরে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে ২০০৪ সালে দেশ ছাড়েন। এরপর থেকে বিদেশে অবস্থান করেই তিনি তাঁর নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি।
বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, দুই দশকের বেশি সময় ধরে সাজ্জাদ আলী দেশের বাইরে বসে নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী চক্র নিয়ন্ত্রণ করছেন। ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাতেও তাঁর নাম রয়েছে, যেখানে তিনি সাজ্জাদ খান নামে তালিকাভুক্ত।
চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশসহ নগরের একাধিক থানা এবং হাটহাজারী ও রাউজান এলাকায় তাঁর বাহিনীর প্রভাব রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। চাঁদা আদায়ে ব্যর্থ হলেই গুলি বা হামলার ঘটনা ঘটানো তাদের কৌশল বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত বছরের আগস্টের পর থেকে জেলায় সংঘটিত অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে এই বাহিনীর সদস্যদের নাম উঠে এসেছে। কখনো আধিপত্য বিস্তার, আবার কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবেও তারা কাজ করেছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নেতৃত্ব ও সক্রিয় সদস্যরা
২০১৫ সালের পর দেশে সাজ্জাদ বাহিনীর নেতৃত্বে আসেন ছোট সাজ্জাদ নামে পরিচিত সাজ্জাদ হোসেন, যিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাঁর গ্রেপ্তারের পর নেতৃত্ব যায় মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের হাতে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন সক্রিয় শুটার ও সহযোগী রয়েছে। খোরশেদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদসহ অনেকেই অস্ত্র ব্যবহারে দক্ষ। বিদেশে অবস্থান করেও সাজ্জাদ নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে নির্দেশনা দেন বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশ বলছে, সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়; বরং নগরের অপরাধচক্রের সক্রিয় উপস্থিতিরই নতুন বহিঃপ্রকাশ। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
-পতাকানিউজ

