ডেডলাইন ১৩ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার। এদিন ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণার কথা রয়েছে। এছাড়া একইদিন এ রায় দেয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ঢাকায় লকডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এ কর্মসূচি প্রতিহত করতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এসবের মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা। বিভিন্ন জায়গায় ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেয়ার মত ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঘুরপাক খাচ্ছে নানা প্রশ্ন। ১৩ নভেম্বর কী হবে? তাই সবার চোখ এখন ঢাকায়।
এদিকে ১৩ নভেম্বর ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। এছাড়া রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী।
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে ঢাকার ১৫টি স্থানে ১৭টি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে এবং গত দুদিনে ৯টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৭টি মামলা হয়েছে। আর নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে শঙ্কার কারণ নেই জানিয়ে সব বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ১৩ নভেম্বরের কর্মসূচি রুখে দেয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
অপরদিকে পরিস্থিতি যাই হোক লকডাউন কর্মসূচি মাধ্যমে ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার দাবি আওয়ামী লীগ নেতাদের। বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম ও দলটির মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট বানিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ভুয়া রায় দেয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধেই লকডাউন কর্মসূচি পালন করতে যাচ্ছেন তারা।’
এদিকে ফ্যাসিবাদী শক্তির নাশকতা-অপতৎপরতা প্রতিরোধে ১৩ নভেম্বর দেশব্যাপী রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন ৮ দলের নেতাকর্মীরা। বুধবার, ১২ নভেম্বর দুপুরে মগবাজার আল ফালাহ মিলনায়তনে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ৮ দলের পক্ষ থেকে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এ ঘোষণা দেন।
একইদিন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ১৩ নভেম্বর ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি ঘিরে সারাদেশের নেতাকর্মীদের মাঠে থাকার নির্দেশ দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে এ আহ্বান জানান সংগঠনটির সভাপতি রিফাত রশিদ।
এর আগে মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জুলাই ঐক্যের মুখ্য সংগঠক মোসাদ্দেক ইবনে মোহাম্মদ জানান, ১৩ নভেম্বর নৈরাজ্য এবং প্রশাসনের বিতর্কিত পদক্ষেপের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান ও বিক্ষোভ মিছিল করবে।
এছাড়া ১৩ নভেম্বর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব দোকান ও বিপণিবিতান খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি ও ঢাকা মহানগর দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৩ নভেম্বর আসলে কী হবে? এ নিয়ে দেশবাসী উদ্বিগ্ন এবং উৎকণ্ঠায় আছেন। এছাড়া গত দুদিনে যা হয়েছে তাতে মানুষ আতঙ্কিত। রাজনৈতিক মীমাংসা না হলে এ ধরনের পরিস্থিতিবারবার হতেই থাকবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ১৩ নভেম্বর ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচির ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্ত অবস্থানে রয়েছে, ওইদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। রাস্তার ধারে পেট্রোল বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি।’
পাশাপাশি, অস্ত্র উদ্ধারের কার্যক্রম অব্যাহত আছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও বড় ধরনের কোনও ঘটনা ঘটেনি। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।’
এদিকে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এমন ঘোষণার পর প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো। কাজেই দ্রুতই এগিয়ে আসছে নির্বাচনের সময়। কিন্তু নভেম্বরের শুরুতেই হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনীতির মাঠ।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে আওয়ামী লীগের ঢাকা লকডাউন কর্মসূচি কতটা সফল হবে এবং অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে তা মোকাবেলা করবে—এর মধ্য দিয়ে হয়ত নির্বাচনের জল কোনদিকে গড়াবে তার হয়ত কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যেতেও পারে। যদিও রাজনীতেতে শেষ বলে কিছু নেই, তাই ওইদিন এসব কিছু বুঝা নাও যেতে পারে। কাজেই কোনো অজুহাতে কিংবা কোনো কারণেই যাতে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বানচাল হয়ে না যায় সেদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে খেয়াল রাখতে হবে বলে মত বিশ্লেষকদের।
পতাকানিউজ/আরবি

