বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চলতি অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাসে সরকারি পরিচালন খরচের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই খরচ ১ লাখ ৪ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা প্রথমবারের মতো এক লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। এই বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ। এই ধরনের খরচ অপরিহার্য হলেও, এটি সরকারের বাজেটের সিংহভাগ দখল করে নেয়, যার ফলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবহার কমে যায়। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের উন্নয়নমূলক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
অন্যদিকে, উন্নয়ন খাতে খরচের হার গত ৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে মাত্র ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে, যা মোট এডিপির শুধুমাত্র ৫ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে এই খরচ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল, এমনকি আন্দোলনের সময়ও। এই কম খরচের পেছনে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, যেমন অনেক প্রকল্পের ঠিকাদার এবং পরিচালকদের অনুপস্থিতি, নতুন ঠিকাদার নিয়োগের বিলম্ব এবং প্রকল্পগুলোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে, কারণ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সরাসরি লক্ষ লক্ষ মানুষের আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এই স্থবিরতা অর্থনীতির সামগ্রিক গতিকে প্রভাবিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ১৭ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি দেখিয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতির পেছনে ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দাভাব মূল কারণ, যা আমদানি এবং বিনিয়োগের হার কমিয়ে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভোগ্যপণ্যের আমদানি ৫ শতাংশ, মূলধনি যন্ত্রপাতির ১১ শতাংশ এবং মধ্যবর্তী পণ্যের ১৮ শতাংশ কমেছে।
এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, বছরের শেষভাগে এই ঘাটতি পূরণের সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বর্তমান স্থিতি সরকারের ব্যয় জোগানে চাপ সৃষ্টি করছে। এই ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার ব্যাংকঋণ, ট্রেজারি বিল এবং বন্ডের উপর নির্ভর করছে, যা সুদের হার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় আরও খরচ বাড়াচ্ছে।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব স্পষ্ট। অক্টোবর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.১৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ স্তরে রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ সত্ত্বেও এটি এখনো অনেক বেশি। মূল্যস্ফীতির সাথে পাল্লা দিয়ে মজুরি বৃদ্ধি না হওয়ায় প্রকৃত আয় কমেছে, যা ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে টানা তিন বছর ১০ মাস ধরে চলছে। ফলে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে এবং কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ বেড়েছে, বিশেষ করে যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার উচ্চ। সরকারি হিসাবে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ, কিন্তু ছদ্মবেকার (পছন্দমতো কাজ না পাওয়া) প্রায় এক কোটি। এই পরিস্থিতি সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও মন্থর করে।
ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চাহিদার নিম্নগতি এবং বিনিয়োগের অভাব থেকে উদ্ভূত। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি গত আগস্টে ৬.৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছর এটি ৯.৮৬ শতাংশ ছিল। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কিছু বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের (যেমন এস আলম, বেক্সিমকো ইত্যাদি) বিরুদ্ধে তদন্তের কারণে উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমেছে। ফলে কারখানা বন্ধ বা কাজের গতি কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ হ্রাস পাচ্ছে। এই মন্দাভাব অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রত্যাশিত ঘুরে দাঁড়ানোকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
ইতিবাচক দিক হিসেবে, আমদানির চাহিদা কমায় ডলারের খরচ কমেছে, যার ফলে রিজার্ভ বেড়েছে। ৩০ অক্টোবরে এটি ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যদিও পরে কিছুটা কমেছে। প্রবাসী আয় সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ২৫০ কোটি ডলারের বেশি এসেছে এবং রপ্তানিতে ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে (প্রথম চার মাসে ১,৬১৪ কোটি ডলার)। তবে এই প্রবৃদ্ধি আগের চেয়ে কম, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য যথেষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেমন সিপিডির মোস্তাফিজুর রহমান, সরকারের খরচের চাপ বাড়ছে কারণ বেতন-ভাতা, সুদ এবং ভর্তুকিতে বাজেটের বেশিরভাগ খরচ হয়ে যায়। রাজস্ব আদায় না বাড়লে এই চাপ আরও বাড়বে। পরিকল্পনা কমিশনের মনজুর হোসেন মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়াতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা প্রয়োজন। সময়মতো নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণ হলে অর্থনীতির উন্নতি সম্ভব। সার্বিকভাবে, অর্থনীতির স্থবিরতা কাটাতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করা এবং বিনিয়োগ উত্সাহিত করা জরুরি, অন্যথায় দারিদ্র্য এবং বেকারত্বের চক্র আরও গভীর হবে।
পতাকানিউজ/এনটি

