রাত তখন ১টা। টেকনাফের বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া ঘাটঘেঁষা অন্ধকার বিচ এলাকা। চারদিকে সাগরের গর্জন আর গভীর নীরবতা। ঠিক এমন সময় একদল নারী, পুরুষ ও শিশু আত্মগোপন করে অপেক্ষা করছিল মালয়েশিয়াগামী একটি অনিশ্চিত নৌযাত্রার জন্য। কিন্তু সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত পরিণত হলো উদ্ধার অভিযানে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ও পুলিশের সমন্বিত তৎপরতায় গভীর রাতে উদ্ধার করা হয় নারী-শিশুসহ মোট ২৮ জনকে। তারা প্রত্যেকেই সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার লক্ষ্যে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের টোপে পা দিয়েছিলেন।
কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক জানিয়েছেন, ‘সোমবার, ২৪ নভেম্বর দিবাগত রাত ১টায় বাহারছড়া আউটপোস্ট থেকে অভিযান পরিচালনা করে এই উদ্ধার অভিযান সফল করা হয়।’
স্বপ্ন দেখিয়ে মৃত্যু-ঝুঁকির পথে ঠেলে দেয় পাচারকারীরা। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই টেকনাফসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন। কেউ রোহিঙ্গা শিবির থেকে, আবার কেউ হতাশাজনক জীবনযাপনের চক্র থেকে বেরোবার চেষ্টা করেছেন। তাদের জবানিতে উঠে আসে এ তথ্য।
মালয়েশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরি, উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি এবং অল্প খরচে বিদেশ যাত্রার লোভ। এই তিন মোহে পড়ে তারা বিশ্বাস করেছিলেন বিভিন্ন দালালচক্রের কথা। কিন্তু বাস্তবে তাদের সামনে অপেক্ষা করছিল বিপজ্জনক সাগরযাত্রা যেখানে নৌকা ডুবি, প্রাণহানি কিংবা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক।
কোস্ট গার্ড জানায়, তাদের উপস্থিতি টের পেয়েই পাচারকারীরা অন্ধকারে পালিয়ে যায়। ফলে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট চক্রগুলোকে শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক বলেন, ‘মানবপাচারকারীরা অত্যন্ত সুসংগঠিত। তাদের শেকড় অনেক গভীরে। তবে মানবপাচার রোধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং থাকবে। উদ্ধার ২৮ জনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর বা নিরাপদ আবাসনে স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সাথে সাথে পাচারচক্র শনাক্ত ও আটক করতে মাঠে আছে কোস্ট গার্ডের বিশেষ টিম।’
সাগরপথে মালয়েশিয়া কেন থামছে না জীবনঝুঁকির এই প্রবাহ? এমন প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘দারিদ্র্য, চাকরির অভাব, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং উন্নত জীবনের স্বপ্ন সব মিলিয়ে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই যাত্রা তাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসে মৃত্যু অথবা নিখোঁজ হওয়ার অন্ধকার অধ্যায়ে।’
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, পাচারচক্রগুলো পরিবারভিত্তিক বিশ্বাসকে কাজে লাগায়। গ্রামীণ জনপদ থেকে তারা সহজেই মানুষ খুঁজে নেয় এবং তাদের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণার জালে আটকে ফেলে।
এর আগে গত ৪ নভেম্বর টেকনাফের গহিন পাহাড়ে পাচারের উদ্দেশ্যে বন্দি থাকা নারী ও শিশুসহ ২৫ জনকে উদ্ধার করা হয় কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর যৌথ অভিযানে। এসময় ২ জন মানবপাচারকারীকে আটক করা হয়। ওই সময়ও একই প্রক্রিয়ায় সাগর পথে মালয়েশিয়া পাচারের জন্য ওই ২৫ জনকে টেকনাফের বাহারছড়ার জুম্মা পাড়া সংলগ্ন গহিন পাহাড়ি এলাকায় বন্দি করে রাখা হয়েছে।
পতাকানিউজ/আরএস/এএইচ

