সাজ্জাদ আলী খান। চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের মুর্তিমান আতঙ্ক। যে নামাতঙ্কে লাখো মানুষের ঘুম হারাম হয়। সেই মানুষটি কিন্তু বাংলাদেশে নেই। বসে আছেন ভারতে। আবার ভারতে তার নাম ভিন্ন। সেখানকার পরিচিত নাম আবদুল্লাহ বা কখনো কখনো আব্দুল্লাহ আল মামুন।
কথিত এই সন্ত্রাসী চট্টগ্রামের অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করেন হোয়াটসঅ্যাপ মাধ্যমে ফোন করে। টার্গেট করা ব্যবসায়ী কিংবা ব্যক্তির কাছ থেকে চাঁদা দাবি করেন। না পেলে তার নির্দেশে অনুগত গুন্ডাবাহিনী গিয়ে গুলি চালায়। এমন মুর্তিমান আতঙ্ক সাজ্জাদ ভারতে অবস্থান করলেও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় সাজ্জাদকে দেশে ফিরিয়ে আনেনি। ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী হত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাজ্জাদের বিষয়ে রহস্যজনক কারণে আওয়ামী লীগ ছিল উদাসীন। ফলে এখনো সাজ্জাদ ভারতে বসে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়াল্ড নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাচ্ছে বলে দাবি করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
অবশ্য, ২০১২ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে সাজ্জাদকে ফেরানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ উদ্যোগও ছিলেন। কিন্তু সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
সাজ্জাদকে ফেরানোর ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কচ্ছপ গতিতে হাঁটলেও ওই সরকারের সময়ে ১০ অস্ত্র মামলার বিচারিক কার্যক্রম তড়িৎবেগে চলেছে। সাবেক মন্ত্রীসহ একাধিক সরকারি কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। ভারতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন উলফার নেতা বাংলাদেশে বন্দি থাকা অনুপ চেটিয়াকে ভারতীয় বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছে আওয়ামী লীগ। আবার ভারতে আত্মগোপনে থাকা বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি থাকার পরও সাজ্জাদকে রহস্যজনক কারণে ফেরায়নি আওয়ামী লীগ সরকার।
সাজ্জাদকে না ফেরানোর দায় আওয়ামী লীগ সরকারের উল্লেখ করে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের একজন আইনজীবী পতাকানিউজকে বলেছেন, ‘ওই সময় যদি আওয়ামী লীগ সরকার সাজ্জাদকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করতো, তাহলে এখন চট্টগ্রামে যেসব হত্যাকাণ্ড এবং চাঁদাবাজি হচ্ছে -সেটা হতো না। তাই এই দায় আওয়ামী লীগের।’ আইনজীবীরা বলেন, ‘বহুল আলোচিত এইট মার্ডার মামলায় সাজ্জাদের ফাঁসির দণ্ড হয়েছিল। এছাড়া একে-৪৭ সহ গ্রেপ্তারের পর অস্ত্র মামলা ছিল সাজ্জাদের বিরুদ্ধে। এরপরও সাজ্জাদ বাংলাদেশে সাজা ভোগ থেকে নিজকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছে। আর এখন ভারতে বসে চট্টগ্রামকে অশান্ত করছে।’
দুবাই থেকে ভারতে সাজ্জাদ
সাজ্জাদ চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম গণি কন্ট্রাক্টর। এই সাজ্জাদ প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৯৯ সালের ২ জুন। ওইদিন পাঁচলাইশ ওয়ার্ড কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খানকে বাড়ির সামনে হত্যার অভিযোগ উঠে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে। এরপর ২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাট এলাকায় ৬ ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীসহ ৮ জনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যার ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়েছিল। একই বছরের ১ অক্টোবর একে-৪৭ রাইফেলসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যায় সাজ্জাদ। পরে ২০০৪ সালে আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে দুবাই পালিয়ে যায়।
সাজ্জাদ পলাতক থাকলেও ওই সময় চট্টগ্রামের আদালতে এইট মার্ডার মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলমান ছিল। বিচারিক আদালত ২০০৮ সালে সাজ্জাদসহ চারজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবত কারাদণ্ডের রায় দেয়।
পরবর্তীতে সরকার তথ্য পায়, ২০১২ সালের ৭ নভেম্বর ভারতের অমৃতসর বিমানবন্দর থেকে দুবাই যাওয়ার প্রাক্কালে সাজ্জাদ ভারতীয় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। ওই সময় সরকার জানিয়েছিল, সাজ্জাদ ভারতে যাতায়াত করেন এবং এক নারীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। আর ওই সময় সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার খবর আওয়ামী লীগ সরকার জানতে পেরেছিল ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ব্যুরো (এনসিবি) নয়াদিল্লি শাখার মাধ্যমে। ওই শাখার একটি চিঠির (স্মারক আইপি-১২/১০/২০১২) মাধ্যমে। ওই চিঠিতে বাংলাদেশের এনসিবি শাখাকে সাজ্জাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
চিঠি চালাচালি, ফলাফল শূন্য
প্রাপ্ত তথ্য মতে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাজ্জাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে ঘোষিত দণ্ড বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়ে ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর একটি চিঠি দেয়। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনারের কাছে এ চিঠি পৌঁছার পর সেখান থেকে চিঠিটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসে। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে তথ্য জানতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তরকে চিঠি দেয়। সেই চিঠির কপি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে পৌছার পরই বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছিল।
২০১২ সাল পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ নানাভাবে চেষ্টা করেও সাজ্জাদকে দেশে ফেরাতে পারেনি। তখনকালীন সময়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে দায়িত্বপালন করেছিলেন একজন পদস্থ কর্মকর্তা, যিনি বর্তমানে অতিরিক্ত ডিআইজি পদে কর্মরত আছেন। তিনি পতাকানিউজের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘ওই সময় সিএমপি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিল। এরপরও ওই সময়ের সরকার কেন সাজ্জাদকে ফেরাতে পারেনি সেটা আমি বলতে পারবো না।’
ওই সময় সিএমপিতে কর্মরত ছিলেন এমন অন্য একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার জানা মতে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর ভারত সফরের সময় সাজ্জাদ এবং সুব্রত বাইনের বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করেছিলেন। পরে জেনেছিলাম সুব্রত বাইনকে দেশে আনা হয়েছে। কিন্তু সাজ্জাদকে আনা হয়নি। কেন ওই সময় সাজ্জাদকে ফেরানো যায়নি-সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আমার কাছে নেই।’
সাজ্জাদকে ফেরানোর দেনদরবারের মধ্যেই ২০১৪ সালে উচ্চ আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পান সাজ্জাদ। পরে বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আর কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।
সাজ্জাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় পরিবর্তন
সাজ্জাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কেন পরিবর্তন হয়েছিল? -এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের ওই সময়ে দায়িত্বপালনকারী পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুর রশিদ পতাকানিউজকে বলেন, ‘ওই সময় সাক্ষীরা ভয়-ভীতির কারণে প্রকৃত সত্য জেনেও আদালতের কাছে সত্য গোপন করেছিলেন। দুর্বল সাক্ষ্য দিয়েছিলেন সাক্ষীরা। এই কারণেই মৃত্যুদণ্ডের রায় থেকে খালাস পেয়েছিল সাজ্জাদ।’
ভারতে পালিয়ে থাকা সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ওই সময় বায়েজিদ ও পাঁচলাইশ থানায় ১২টি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। ২০১২ সালে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করেছিল। সেখানে তার নাম লেখা ছিল খান সাজ্জাদ হোসেন ওরফে সাজ্জাদ ওরফে শিবির সাজ্জাদ ওরফে আবদুল্লাহ ওরফে আব্দুল্লাহ আল মামুন।
ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার প্রচেষ্টা থেকে রক্ষা পাওয়া সাজ্জাদ এখনো সেই দেশে বাস করছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। আর তার অনুসারীদের দিয়ে চট্টগ্রামে ত্রাসের রাজত্ব করে চলেছেন বলে অভিযোগ আছে। সবশেষ সরোয়ার বাবলা হত্যা মামলায় সাজ্জাদকে ১ নম্বর আসামি করা হয়। অর্থাৎ, দেশের বাইরে থেকেও হত্যা মামলার আসামি হয়েছেন সাজ্জাদ। মামলার এজহারে বাদী আব্দুল কাদের উল্লেখ করেছেন, গত এক সপ্তাহ আগে ১নং বিবাদী বড় সাজ্জাদ বিদেশ হইতে মোবাইল ফোনে হোয়াটসএ্যাপে কল কিরয়া আমার ছেলে সরোয়ারকে হুমকি দিয়া বলে যে ‘তোমার সময় শেষ যা খাওয়ার খেয়ে নাও’। বাদীর দাবি, বড় সাজ্জাদ বিদেশে বসে মোবাইল ফোনে চাঁদাবাজি করছে এবং তার ছেলে সরোয়ার এসবে বাধা দেয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে হুমকি দেয় বড় সাজ্জাদ। অবশ্য, নিহত সরোয়ার এক সময় বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিল এবং পরে স্বার্থের দ্বন্ধে তাদের পথ ভিন্ন হয়ে যায় বলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রাথমিক অনুসন্ধানে জেনেছে।
বিদেশে বসে চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড
বিদেশে বসে চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং হত্যার বিষয়ে জানতে সাজ্জাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সাজ্জাদের হোয়াটঅ্যাপ নম্বর বন্ধ পাওয়ায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে বাকলিয়ায় জোড়া খুনের পর গত ২৬ জুলাই এক দফা সাজ্জাদের সঙ্গে পতাকানিউজের কথা হয়েছিল। ওই সময় প্রশ্নের জবাবে সাজ্জাদ বলেছিলেন, ‘আমি ৩০ বছর ধরে দেশের বাইরে আছি। আমার দ্বারা এ সব ঘটনা ঘটানো কিভাবে সম্ভব। আমি সেই সব ঘটনাস্থলে ছিলাম না। যারা এসব করছে তাদের কাছে জিজ্ঞেস করতে পারেন।’ তিনি দাবি করেছিলেন, চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি ও খুনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে তিনি যুক্ত নন।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াসহ একাধিক নেতাকে কৌশলে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা এবং বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হলেও সাজ্জাদকে ফেরাতে কেন আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হয়েছে? একইভাবে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের খুনের ঘটনায় দণ্ডিত আসামিকে আওয়ামী লীগ কী দলীয়ভাবে ক্ষমা করে দিয়েছিল? –এমন দুটি প্রশ্নের উত্তর জানতে পতাকানিউজ চেষ্টা করে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতা লাপাত্তা হয়েছেন। ফলে চেষ্টা করেও আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট কারো বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
পতাকানিউজ/কেএস

