মাত্র ২১ দিন আগে স্ত্রী-সন্তানকে জড়িয়ে বিদায় নিয়েছিলেন সাহাব উদ্দিন। সাত মাসের সন্তানকে শেষবার কোলে নিয়েছিলেন সেদিনই। তারপর ঘরে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়ে উড়াল দেন দূর প্রবাসে ওমানে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর রাখলেন না তিনি। বুধবার, ৮ অক্টোবর বিকেলে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন তিনি। সঙ্গে আরও ছয়জন স্বজন সবার বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সারিকাইত ইউনিয়নে। নিহত অপর একজনের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায়।
দূর দেশে রোজগারের আশায় যাওয়া সাত তরুণ এখন ফিরে আসবেন কফিনবন্দি হয়ে। একসঙ্গে এত মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো ইউনিয়নে। কেউ হারিয়েছেন স্বামী, কেউ ভাই, কেউ সন্তান। সারিকাইতের বাতাসে এখন শুধু কান্না আর আহাজারি।

নিহত সাতজনই সারিকাইত ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে ৬ জনের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন:
মোহাম্মদ আমিন সওদাগর (পিতা: আলী আকবার সেরাং), আরজু (পিতা: শহীদ উল্লা) মোহাম্মদ বাবলু (পিতা: মনু মিয়া), সাহাব উদ্দিন (পিতা: সিদ্দিক আহমেদ), মোহাম্মদ রকি (পিতা: ইব্রাহিম মিস্ত্রি), জুয়েল (পিতা: জামাল উদ্দিন) ও জিয়াউল ইসলাম নূর।
নিহতদের একজন জিয়াউল ইসলাম নুর। সকালে শেষবার ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন চার মাসের শিশুপুত্রের সঙ্গে। দূরদেশে থেকেও হাসিমুখে বলেছিলেন, ‘বাবা, আমি আসছি তোমার খেলনা নিয়ে।’ বিকেল নাগাদ সেই বাবাই পরপারে পাড়ি জমান। দেড় বছর আগে ছুটিতে এসে বিয়ে করেছিলেন। এবার আসার কথা ছিল বাচ্চাকে কোলে নিতে, কিন্তু ফিরবেন লাশ হয়ে।
একই গ্রামের বাবুলেরও ছিল দুই সন্তান। প্রবাসের কষ্ট সহ্য করে বাড়ির স্বপ্ন গড়ছিলেন। পরিবার বলছে, ‘আর কিছুদিন পরেই তার দেশে আসার টিকিট কাটা ছিল।’ কিন্তু সেই দিন আসার আগেই সব শেষ।
ওমানের দুকুম সিদরা এলাকায় বুধবার স্থানীয় সময় বিকেলে ঘটে দুর্ঘটনাটি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাছ ধরার কাজ শেষে সাগর থেকে ফেরার পথে প্রবাসীদের বহনকারী গাড়িটি উল্টে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান ৮ বাংলাদেশি। নিহতদের ৭জনই সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের একই ওয়ার্ডের বাসিন্দা।
বর্তমানে মরদেহগুলো দুকুম হাসপাতালের মর্গে রাখা আছে। ওমানে অবস্থানরত অন্যান্য প্রবাসীরা জানাচ্ছেন, দুর্ঘটনার পর থেকে ওই এলাকার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নিহত সাহাব উদ্দিনের মা বুক চাপড়ে বললেন, ‘আমার ছেলে তো পরিবারের হাল ধরেছিল। সে না থাকলে আমরা এখন কেমনে বাঁচব?’ পাশে কাঁদছেন তার স্ত্রী। কোলের শিশুটি কিছুই বুঝে না, শুধু মায়ের কান্না শুনে কাঁদছে।

স্থানীয়রা জানান, এই সাতজনই ছিলেন দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা। সংসারের অভাব ঘোচাতে সাগরে মাছ ধরা, নির্মাণকাজ, বা সাধারণ শ্রমের কাজ করতেন তারা। কেউই শিক্ষিত পেশাজীবী ছিলেন না, কিন্তু পরিবারের জন্য তাদের অবদান ছিল অপরিসীম।
বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির অন্যতম গন্তব্য ওমান। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর দেশটি বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক সেখানে কাজ করেন। কিন্তু অনেকেই দুঃসহ পরিবেশে জীবনযাপন করেন নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বা শ্রমিক কল্যাণব্যবস্থা।
পতাকানিউজ/এএস/কেএস

