‘চাঁদনী ঘাটের সিঁড়ি, আলী আমজদের ঘড়ি, বঙ্কু বাবুর দাড়ি, জিতু মিয়ার বাড়ি’—সিলেটের ঐতিহ্য বহনকারী এই প্রবাদটির মধ্যে উল্লেখিত আলী আমজদের ঘড়িঘর আজও জেলার আইকনিক নিদর্শন। অথচ সেই ঘড়িঘরের পাশে নির্মাণ শুরু হয়েছে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। এতে ক্ষোভে ফুঁসছে সিলেটবাসী।
পাথর লুটকাণ্ডে বিতর্কিত হয়ে সদ্য প্রত্যাহার হওয়া জেলা প্রশাসক (ডিসি) শের মোহাম্মদ মাহবুব মুরাদের নেতৃত্বাধীন কমিটিই জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য এ স্থানের অনুমোদন দিয়েছে। অথচ ঐতিহ্যবাহী আলী আমজদের ঘড়িঘরের সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক)। সিসিক জানায়, জাতীয় প্রকল্প হিসেবে জেলার বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের স্তম্ভ নির্মিত হচ্ছে; সিলেট অংশের স্থান নির্ধারণ করেছে জেলা প্রশাসন।
সিসিকের প্রধান নির্বাহী রেজাউল করিম পতাকানিউজকে বলেন, জুলাই বিপ্লবের বছরপূর্তিতে দ্রুত স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা হলে ভালো হতো।
নাগরিক সমাজের অভিযোগ
কিন্তু সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ—এভাবে স্থাপনা নির্মাণ হলে ঐতিহাসিক ঘড়িঘরের সৌন্দর্য বিনষ্ট হবে এবং স্থাপত্য শৈলীর গুরুত্ব হারাবে। সাবেক ডিসির এ সিদ্ধান্তকে তারা ‘কুকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
আলী আমজদের প্রপৌত্র নবাব আলী হাসিব খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ঘড়িঘর সিলেটের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই নতুন কোনো স্থাপনা দিয়ে এটিকে ঢেকে ফেলার প্রচেষ্টা মেনে নেয়া হবে না। একই সুরে কথা বলেছেন সাবেক সাংসদ নবাব আলী আব্বাস খান এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন।
সোমবার নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে নতুন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি সরিয়ে নেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ডিসি জানিয়েছেন, তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
নবাব আলী হাসিব খান লিখেন, ‘আলী আমজদের ঘড়ি শুধু আমার পরিবারের জন্যই নয়, সিলেটের প্রতিটি মানুষের কাছে এক অসীম ঐতিহ্যের প্রতীক। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সিলেটবাসীর চেতনাকে প্রভাবিত করে আসছে যুগ যুগ ধরে। এই ঘড়িটি আমাদের শহরের এক পরিচিত এবং প্রিয় চিহ্ন, যা সিলেটের এক অনন্য ঐতিহ্য এবং গৌরবের প্রতীক। তাই, এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাকে ধ্বংস করে কিছু নতুন নির্মাণ করার পক্ষে আমরা নই। আমাদের কর্তব্য হলো এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা অক্ষুণ্ণ রাখা। এই কাজ বন্ধ করে অন্য জায়গায় করার দাবি জানাচ্ছি না হয় আমরা কঠোর আন্দোলনের ডাক দিব।’
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সিলেটে আশি ও নব্বই দশকে গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক, ‘প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা’ পত্রিকার সম্পাদক ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এ নিয়ে সিলেটের সুধীজন দ্রুত উদ্যোগী হওয়ার তাগিদ অনুভব করছি। আগের জেলা প্রশাসক বা যেই হোক বড্ড না বুঝে কাজটিতে হাত দিয়েছে। ঐতিহ্য শুধু নয়, সিলেটের সংস্কৃতি, এর ইতিহাসের সঙ্গে এ স্থাপনাটি মিশে আছে। দয়া করে ক্ষান্ত দিন। সিলেটের এসব স্থাপনা আগের মতোই থাকতে দিন। এরমধ্যেই খাওয়া খাওইতো কম হলো না!’
এ ব্যাপারে নবাব আলী আমজদের নাতি সাবেক সংসদ সদস্য নবাব আলী আব্বাস খান বলেন, ‘আমার পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা কর্তৃপক্ষের গৃহীত পদক্ষেপের নিন্দা জানাই। এটি কোনও নির্দিষ্ট পরিবারের বিষয় নয়, তবে এটি সমগ্র সিলেটবাসীর অনুভূতিতে আঘাত করেছে। আশা করি বর্তমান কর্তৃপক্ষ এই ধরনের নির্মাণ বন্ধ করবেন।’

‘সদ্য বিদায়ী ডিসির আরেক কাণ্ড’
সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন সিলেটের প্রধান সমন্বয়ক ও পরিবেশ সংগঠক আব্দুল করিম চৌধুরী কিম জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক খোঁজখবর নিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন যে, এটি সিলেটের সদ্য বিদায়ী ডিসির আরেক কাণ্ড। তার নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি স্থান নির্ধারণ করার কথা থাকলেও তিনি তড়িঘড়ি করে এ ঘড়িঘরে স্থান নির্ধারণ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আলী আমজদের ঘড়ি পৃত্থিমপাশার নবাব পরিবারের দান। এই ঘড়ি সিলেটের ঐতিহ্যের স্মারক। ঘড়িঘরের সীমানার মধ্যে কেন স্থাপনা তৈরি হবে? এই স্থাপনা নির্মাণের ফলে ঘড়িঘরের সৌন্দর্য শুধু বিনষ্ট হবে না, সিলেটের এই ল্যান্ডমার্কের স্থাপত্য শৈলী গুরুত্ব হারাবে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, সরকার যদি তাদের স্মরণে কিছু নির্মাণ করতে চায়, তবে তা কোনোভাবেই সিলেটের এই দেড় শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য বিনষ্ট করে হতে পারে না। সাবেক ডিসির কু-কাণ্ডের এই চিহ্ন অন্যত্র সরানোর দাবি জানাই।’
যোগাযোগ করা হলে সিসিকের জনসংযোগ দপ্তর থেকে জানানো হয়, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে সাবেক জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় একটি কমিটি হয়। এ কমিটি স্থান নির্ধারণ করে দেয়ায় সিসিক স্তম্ভ স্থাপনের কাজটি করছে। দেড়শ বছরের পুরোনো স্থাপনার পাশে নতুন স্থাপনা করতে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শণ আইন লঙ্ঘন হয়েছে? এ প্রশ্নে সিসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা নেহাররঞ্জন পুরকায়স্থ বলেন, ‘সিসিক কেবল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।’
পতাকানিউজ/ইউএম/এসজিএন/কেএস

