‘খেলতে যাচ্ছি’ – বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাকে এটুকুই বলেছিল আট বছরের মেয়েটি। কয়েক ঘণ্টা পর তাকে পাওয়া গেল রক্তাক্ত অবস্থায় পাহাড়ের গভীরে, গলার শ্বাসনালী কাটা। কথা বলতে পারছিল না, তবু বাঁচার চেষ্টা করে হেঁটে নেমে এসেছিল নিচে। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের বিছানায় থেমে গেল সেই লড়াই।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি এখন শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক শিশুর অসমাপ্ত ফিরে আসার গল্প এবং অসংখ্য উত্তরহীন প্রশ্নের কেন্দ্র।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে শিশুটির মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন তার চাচা মো. আব্দুল আজিজ। এর আগে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
রোববার সকালে সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক থেকে চন্দ্রনাথ মন্দিরে ওঠার রাস্তার একটি অংশে সংস্কার কাজ চলছিল। শ্রমিকরা হঠাৎ দেখতে পান, পাহাড়ি পথ ধরে একটি শিশু নিচে নেমে আসছে। তার গলা রক্তে ভেজা।
শিশুটি একটি এক্সকাভেটরের কাছে গিয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু শ্বাসনালী কাটা থাকায় কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। শ্রমিকরা দ্রুত কাপড় দিয়ে গলা বেঁধে রক্তপাত থামানোর চেষ্টা করেন এবং বালুবাহী গাড়িতে করে তাকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
সেখান থেকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। জরুরি অস্ত্রোপচারের পর তাকে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।
বাড়ি থেকে পাহাড়—দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার
শিশুটির বাড়ি সীতাকুণ্ডের ছোট কুমিরা মাস্টারপাড়ায়। আর যেখানে তাকে পাওয়া গেছে, সেটি প্রায় এক হাজার ফুট উঁচু দুর্গম পাহাড়ি এলাকা—বাড়ি থেকে প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে।
পরিবারের দাবি, এত দূরে একটি শিশু একা যেতে পারে না। চাচা আব্দুল আজিজ বলেন, ‘ওখানে কে নিয়ে গেল, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আমরা শুধু চাই সত্য বের হোক।’
ভাইরাল ভিডিও, দেশজুড়ে আলোড়ন
রোববার শিশুটির রক্তাক্ত অবস্থার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি দ্রুত আলোচনায় আসে। মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে—শিশুটি বাঁচবে কি না, কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল—এসব প্রশ্ন ঘুরতে থাকে সামাজিক মাধ্যমে।
ভিডিওতে আহত অবস্থায় শিশুটির বেঁচে থাকার সংগ্রাম অনেককে নাড়া দেয়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটি তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। বাবা একজন শ্রমজীবী মানুষ। ঘটনার দিন সকালে সে মাকে বলে খেলতে যাবে। মা ছোট ভাইকে সঙ্গে নিতে বললেও সে একাই বের হয়ে যায়।
পরিবার জানায়, শিশুটি প্রায়ই দাদীর বাড়িতে যেত এবং চাচাদের বাড়িতে খেলাধুলা করত। ধারণা করা হচ্ছে, সেদিনও হয়তো সেদিকেই যাচ্ছিল। ‘ও প্রায় প্রতিদিনই আসত। কিন্তু কীভাবে পাহাড়ে গেল—এটা আমরা বুঝতে পারছি না।’ – বলেন চাচা।
পুলিশ জানায়, বেলা সাড়ে দশটার দিকে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক এলাকার সহস্রধারা ঝর্ণার আরও উত্তর দিকে পাহাড়ি রাস্তার পাশে শ্রমিকরা শিশুটিকে দেখতে পান। সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই কীভাবে তাকে এত দূরে নেওয়া হলো—এ প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার দিন শিশুটির মা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে অপহরণ ও হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। শিশুটির মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেবে বলে জানিয়েছেন সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শিশুটি কীভাবে সেখানে গেল, কারা জড়িত—সব দিক তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।’
এই ঘটনার পর শোক আর প্রশ্নে ডুবে আছে পরিবারটি। যে শিশু প্রতিদিন দাদীর বাড়িতে দৌড়ে যেত, পরিবারের সবার আদরে বড় হচ্ছিল, সেই শিশুই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হলো। শিশুর চাচা আব্দুল আজিজের কণ্ঠে অসহায়ত্ব ‘হয়তো নির্যাতন করে গলা কেটে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু এতটা পথ হেঁটে বাঁচার চেষ্টা করেছে—এটা ভাবলেও কষ্ট হয়।’
পুলিশ বলছে, ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। অপহরণ, নির্যাতন এবং হত্যার পেছনের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
-পতাকানিউজ

