সুঁই-সুতার নকশায় নিজের ভাগ্যবদল করেছেন বগুড়ার ধুনটের আন্দালিবুল জান্নাত ওরফে কনক। নিজের প্রচেষ্টায় গড়েছেন প্রিয় প্রতিষ্ঠান অহন বুটিকস। জীবনের কঠিন অধ্যায় পেরিয়ে আজ তিনি পরিচিত সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে। আলো ছড়াচ্ছেন গ্রামে। এখন তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ১৫০ জন নারী। কনকের হাতে গড়া পণ্য বিক্রি হচ্ছে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতে।
বগুড়ার ধুনট উপজেলা সদরের কুঠিবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা কনকের স্বামী আতিকুর রহমান একজন ব্যবসায়ী। সংসার ও সন্তানদের যত্নের পাশাপাশি নিজের শখের সেলাই-নকশার কাজকেই তিনি পরিণত করেছেন আয়ের উৎসে।
অথচ এক সময় স্বপ্ন ছিল সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার। কিন্তু জীবনের বাস্তবতায় বিয়ের পর থেমে যায় সে স্বপ্নের পথচলা। তারপরও হার মানেননি কনক। জীবনের কঠিন অধ্যায় পেরিয়ে আজ তিনি পরিচিত সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে।
কনক জানান, ‘ছোটবেলা থেকেই সেলাই ও কুশিকাটার কাজে আগ্রহ ছিল তার। ২০১৯ সালে জীবনের কঠিন এক সময় পার করছিলেন তিনি। মায়ের দেয়া মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেন অনলাইনভিত্তিক সেলাইয়ের কাজ। এরপর ২০২০ সালে করোনাকালে স্বামীর ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে সংসার চালানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন কনক। বাড়ির কাজের ফাঁকে বসে বসে তৈরি করতে শুরু করেন হাতে বানানো পোশাক, সোয়েটার, টেবিল রানার, কুশন কভারসহ নানা রকম পণ্য।
ধীরে ধীরে অর্ডার বাড়তে থাকে, আর সেই সঙ্গে জন্ম নেয় তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান অহন বুটিকস। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে তৈরি হচ্ছে বেডকভার, থ্রি-পিস, বাচ্চাদের পোশাক, পর্দা, শীতের শাল, টেবিল কভার ও নারীদের কুর্তি। প্রতিমাসে সব খরচ মিটিয়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা লাভ থাকে বলে জানান কনক।’

কনক শুধু নিজের জন্য নয়, গ্রামের বেকার নারীদের জন্যও কাজ করছেন। তার উদ্যোগে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ নারী বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন সেলাই ও হাতের কাজে। তাদের অনেকে নিজ নিজ গ্রামে ছোট উদ্যোগ শুরু করে হয়েছেন স্বাবলম্বী।
অহন বুটিকস এর কর্মী ফাতেমা খাতুন, আয়সা আকতার, সাবিনা ইয়াসমিন ও সুখি খাতুন বলেন, ‘আমরা বাড়ির কাজের ফাঁকে কনকের তত্ত্বাবধানে বাহারি পোশাক তৈরি করি। মাসে ৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। এখন আমরা নিজেদের খরচ চালাতে পারি, সন্তানদের লেখাপড়াও চলছে আমাদের হাতে বানানো পণ্যের আয় দিয়ে।
নিজের স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে কনক বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠান আমার সন্তান। আমি চাই অহন বুটিকস একদিন দেশের একটি স্বনামধন্য ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত হোক। আমি সব মেয়েকে বলি নিজের পায়ে দাঁড়ান, নিজের যোগ্যতায় বাঁচুন। মেধা ও পরিশ্রম থাকলে ঘরে বসেই অনেক কিছু সম্ভব।’
আন্দালিবুল জান্নাত কনক আজ ধুনটের নারী সমাজে এক অনুপ্রেরণার নাম। সুঁই-সুতার নকশায় তিনি যেমন সৃষ্টি করছেন সৌন্দর্য, তেমনি বুনছেন আশার, আত্মনির্ভরতার ও স্বপ্নপূরণের গল্প।
ধুনট উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাহিদা সুলতানা বলেন, ‘আন্দালিবুল জান্নাত কনক একজন নারী উদ্যোক্তা। তিনি ধুনটের গর্ব। তার তৈরি পণ্য দেশে- বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছে। সরকারিভাবে আমরা তাকে সার্বিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পরার্মশ প্রদান করছি। তাদের ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থাও করে দিয়ে থাকি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, নারীরা সুযোগ পেলে ঘরে বসেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন। ‘অহন বুটিকস’ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এখন নারী উদ্যোক্তা তৈরির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তার এই প্রচেষ্টাকে সহায়তা করে যাচ্ছি।
পতাকানিউজ/পিএম/এএইচ

