ডিজিটাল যুগে এখন মানুষের পরিচয় নির্ভর করছে বাস্তব জীবনের অর্জনের চেয়ে অনলাইন প্রোফাইলের ওপর। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা ইউটিউব সব জায়গায় একটাই প্রতিযোগিতা কে বেশি জনপ্রিয়? আর এই জনপ্রিয়তার মাপকাঠি এখন ‘ফলোয়ার সংখ্যা’। যত বেশি ফলোয়ার, তত বেশি ‘স্ট্যাটাস’! কিন্তু এই ফলোয়ার ভিত্তিক মানসিকতা অনেক তরুণকে আজ এক অদৃশ্য মানসিক ফাঁদে ফেলে দিচ্ছে।
একটা সময়ে মানুষ সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখতো পড়াশোনা, পেশাগত অর্জন বা সামাজিক অবদানকে। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ‘লাইক’, ‘কমেন্ট’ আর ‘শেয়ার’। অনেক তরুণ সারাদিন নিজের ছবি বা ভিডিও পোস্ট করছে, শুধু একটু বেশি মনোযোগ পাওয়ার আশায়। কিছু মানুষ আবার অল্প সময়ে ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য ‘ফেক আইডি’ বা ‘ফলোয়ার বুস্টার’ ব্যবহার করছে, যা বাস্তবে এক ধরনের প্রতারণা।

তবে এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো, এই ভুয়া জনপ্রিয়তা মানুষকে আত্মমুগ্ধ করে তুলছে। অনেকে ভাবছে যত বেশি ফলোয়ার তত বেশি সম্মান। অথচ এর পেছনে যে মানসিক চাপ, আত্মসম্মানহানি ও অবসাদ লুকিয়ে আছে তা তারা বুঝতে পারছে না।
মানসিক প্রভাব: আত্মবিশ্বাস থেকে আত্মসংশয়
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনলাইন জনপ্রিয়তা না পাওয়া অনেক তরুণের মনে সৃষ্টি করছে হীনমন্যতা ও বিষণ্ণতা। একবার ‘লাইক’ বা ‘কমেন্ট’ কমে গেলে তারা ভাবছে হয়তো আমি এখন কম আকর্ষণীয়! এই ধারনা থেকে তৈরি হচ্ছে আত্মসংশয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মানসিক রোগের ঝুঁকিও থাকে।

অন্যদিকে, যাদের ফলোয়ার বেশি তাদের মধ্যেও দেখা যায় একধরনের ‘ডোপামিন আসক্তি’ অর্থাৎ প্রতিবার নতুন নোটিফিকেশন পেলে মস্তিষ্কে আনন্দ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা এক সময়ে অভ্যাসে পরিণত হয়। এর ফলে বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
ভুয়া ফলোয়ারের ব্যবসা
আজকাল অনেক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টাকা দিয়ে ফলোয়ার কেনার ট্রেন্ড বেড়েছে। এতে অনেকে ভাবছে জনপ্রিয়তা কেনা যায়, কিন্তু বাস্তবে এসব ফলোয়ার বেশিরভাগই অচল অ্যাকাউন্ট। শুধু অস্থায়ীভাবে সংখ্যা বাড়লেও তাতে প্রকৃত সম্মান বা প্রভাব আসে না বরং প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা ভঙ্গের কারণে অনেকের একাউন্টই পরে সাসপেন্ড হয়ে যায়।

সমাধান কোথায়?
সোশ্যাল মিডিয়া কখনই খারাপ নয়, খারাপ হচ্ছে এর ভুল ব্যবহার। ফলোয়ার সংখ্যা দিয়ে নিজের মান যাচাই না করে বরং অনলাইনকে ব্যবহার করতে হবে আত্মোন্নয়ন, জ্ঞান বৃদ্ধি ও ইতিবাচক যোগাযোগের জন্য। বাস্তব জীবনে সম্পর্ক, অর্জন ও আত্মতৃপ্তি এই তিনটি জিনিসই মানুষের প্রকৃত জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হওয়া উচিত।
মনোবিজ্ঞানীরা পরামর্শ দেন, অনলাইন সময়ের একটা সীমা নির্ধারণ করা, নিজেকে অফলাইনে ব্যস্ত রাখা এবং নিজের বাস্তব সত্তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এই তিনটি চর্চা করলে ‘ফলোয়ারসের ফাঁদ’ থেকে সহজেই বেরিয়ে আসা যায়।
পতাকানিউজ/এনএফএম

