‘ইনভেন্টউড’ নামক একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি এমন এক নতুন ধরনের কাঠ তৈরি করেছে, যা স্টিলের চেয়েও ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি, এটি সাধারণ কাঠের তুলনায় প্রায় ৬ গুণ হালকা। ‘সুপারউড’ নামে পরিচিত এই নতুন উপকরণটি ইতোমধ্যেই বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনা হয়েছে।
ইনভেন্টউডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান উদ্ভাবক হলেন উপকরণ বিজ্ঞানী লিয়াংবিং হু। হু বর্তমানে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তবে এক দশকেরও বেশি সময় আগে, ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড-এর সেন্টার ফর ম্যাটেরিয়ালস ইনোভেশনে কাজ করার সময় থেকেই তিনি কাঠকে নতুনভাবে রূপ দেয়ার চেষ্টায় ছিলেন।
গবেষণার অংশ হিসেবে, হু কাঠ থেকে লিগনিন নামক একটি উপাদান আংশিকভাবে অপসারণ করে সেটিকে স্বচ্ছ করতে সক্ষম হন। এই লিগনিনই কাঠকে তার রং ও শক্তির একটি বড় অংশ সরবরাহ করে থাকে। কাঠের গঠন ও বৈশিষ্ট্যে এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে এটি ভবিষ্যতের নির্মাণশিল্প, পরিবহন এবং প্রযুক্তি খাতে এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
হু-এর আসল লক্ষ্য ছিল উদ্ভিদ তন্তুর প্রধান উপাদান সেলুলোজ ব্যবহার করে কাঠকে আরও শক্তিশালী করা। যা হু-এর ভাষায় “পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচুর্যপূর্ণ বায়োপলিমার।” ২০১৭ সালে এ গবেষণায় বড় অগ্রগতি আসে। যখন তিনি প্রথমবার সাধারণ কাঠকে রাসায়নিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে তার প্রাকৃতিক সেলুলোজকে উন্নত করেন, যা কাঠকে আরও টেকসই নির্মাণ উপকরণে পরিণত করে।
প্রথমে কাঠকে নির্দিষ্ট রাসায়নিকসহ পানির একটি দ্রবণে সিদ্ধ করা হয়, এরপর গরম প্রেসে চাপে সংকুচিত করা হয় কোষীয় স্তর পর্যন্ত। সপ্তাহব্যাপী এই প্রক্রিয়ার শেষে তৈরি হওয়া কাঠের শক্তি-ওজন অনুপাত “বেশিরভাগ গঠনগত ধাতু ও সংকর ধাতুর চেয়েও বেশি” বলে ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন, প্রক্রিয়াটি নিখুঁত করতে এবং ১৪০টিরও বেশি পেটেন্ট দাখিল করার পর, হু অবশেষে বাণিজ্যিকভাবে ‘সুপারউড’ চালু করেছেন।
ব্যাখ্যা করেন ইনভেন্টউড -এর প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স লাউ, যিনি ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দেন তিনি বলেন, ‘রাসায়নিক ও ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এখনো কাঠই’। তিনি জানান, ভবিষ্যতে এই কাঠ দিয়ে তৈরি ভবনগুলো বর্তমান কাঠামোর তুলনায় প্রায় চার গুণ হালকা হতে পারে। ফলে এসব ভবন ভূমিকম্পে আরও স্থিতিশীল থাকবে, পাশাপাশি ভিত্তির ওপর চাপও কমাবে—যা নির্মাণ প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজ করে তুলবে।
লাউ আরও বলেন, ‘এটি দেখতে যেমন কাঠের মতো, তেমনি পরীক্ষায়ও ঠিক কাঠের মতো আচরণ করে। পার্থক্য একটাই—এটি কাঠের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী, এবং আমরা যে সব দিক পরীক্ষা করেছি, প্রায় সব ক্ষেত্রেই এটি কাঠের চেয়ে উন্নত।’
ইস্পাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে?
ইনভেন্টউড বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ফ্রেডেরিক শহরে তাদের কারখানায় ‘সুপারউড’ উৎপাদন করছে। লাউ জানান, এখন উৎপাদন প্রক্রিয়ার সময় দিন নয়, ঘণ্টায় মাপা হয়—তবুও বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক পরিসরে উৎপাদনে যেতে কিছুটা সময় লাগবে।
প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি বাইরের ব্যবহারের উপকরণ যেমন ডেকিং ও ক্ল্যাডিং এর দিকে মনোযোগ দেবে। এরপর আগামী বছর থেকে ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের পণ্য যেমন দেওয়ালের প্যানেল, মেঝের ফ্লোরিং এবং গৃহসজ্জার আসবাবপত্র উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইনভেন্টউডের প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স লাউ বলেন ‘মানুষের চিরাচরিত অভিযোগ—আসবাবপত্র সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর প্রধান কারণ হলো কাঠের সংযোগস্থল বা জয়েন্টগুলো ঢিলে হয়ে যায় বা ভেঙে পড়ে। বর্তমানে এসব অংশ ধাতু দিয়ে তৈরি করা হয়, কারণ কাঠ যথেষ্ট মজবুত নয়।’
লাউয়ের মতে, ‘সুপারউড’ এ ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী সমাধান হতে পারে। এটি শুধু আসবাবের জয়েন্ট নয়, স্ক্রু, পেরেক এবং অন্যান্য ধাতব সংযোজক অংশেরও বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে পুরো একটি ভবনই ‘সুপারউড’ দিয়ে নির্মাণ করা সম্ভব হতে পারে যদিও এর আগে আরও গবেষণা ও পরীক্ষা প্রয়োজন।
হু-এর মূল গবেষণার মতোই, ‘সুপারউড’ তৈরির প্রক্রিয়ায় কাঠকে একটি বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তিশালী করা হয়। এতে সেলুলোজের মৌলিক গঠন পরিবর্তিত হয় এবং কাঠকে অত্যন্ত ঘনভাবে সংকুচিত করা হয়, যাতে তা আর আগের অবস্থায় ফিরে না আসে।
বলেন লাউ ‘তত্ত্বগতভাবে আমরা যেকোনো ধরনের কাঠ ব্যবহার করতে পারি,’ ‘বাস্তবে আমরা ১৯টি ভিন্ন প্রজাতির কাঠ ও বাঁশের ওপর পরীক্ষা চালিয়েছি সব ক্ষেত্রেই সফল ফলাফল পেয়েছি।’
ইনভেন্টউডের দাবি, ‘সুপারউড’ সাধারণ কাঠের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি শক্তিশালী এবং ১০ গুণ বেশি দাগ ও চাপ প্রতিরোধী। কারণ এর প্রাকৃতিক ছিদ্রযুক্ত কাঠামোকে সংকুচিত ও শক্ত করা হয়েছে। ফলে এটি ছত্রাক ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকেও সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। শুধু তাই নয়, অগ্নি-নিরোধক পরীক্ষাতেও এটি সর্বোচ্চ মানের রেটিং অর্জন করেছে, যা নির্মাণশিল্পে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
বর্তমানে ‘সুপারউড’ সাধারণ কাঠের তুলনায় বেশি দামী এবং এর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্বন নিঃসরণও তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে ইস্পাত উৎপাদনের তুলনায় ‘সুপারউড’ তৈরিতে কার্বন নিঃসরণ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কম।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য কাঠের চেয়ে সস্তা হওয়া নয়, বরং ইস্পাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা।’ উৎপাদন পরিসর বাড়লে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে আশা লাউয়ের।
পতাকানিউজ/টিআইএ/আরবি

