চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা ইস্যুকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে গুরুতর বিঘ্ন, যা দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও রপ্তানি আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, শিপমেন্ট বিলম্বিত হলে ক্রয়াদেশ বাতিল, ডিসকাউন্ট দাবি কিংবা অর্ডার অন্য দেশে স্থানান্তরের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বন্দরে আটকে থাকা পণ্য সময়মতো পাঠানো না গেলে এয়ার শিপমেন্টে পাঠাতে হতে পারে, এতে ব্যয় বহুগুণ বাড়বে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার টিইইউএস পণ্য খালাস হলেও বুধবার থেকে কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে অন্তত ৫৪ হাজার কনটেইনার বন্দরে আটকে পড়েছে এবং বহিঃনোঙ্গরে প্রায় ১৪২টি জাহাজ পণ্য নিয়ে অপেক্ষা করছে।
তিনি বলেন, খালাস বিলম্বিত হওয়ায় আমদানিকারকদের প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় গুনতে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ সম্ভব না হলে ক্রয়াদেশ বাতিল বা অন্য দেশে স্থানান্তরের ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সংকট হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প বাজারে চলে যেতে পারেন।
পোশাক খাতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বন্দরে আটকে থাকা পণ্য সময়মতো পাঠানো না গেলে ক্রেতারা ডিসকাউন্ট চাইতে পারেন অথবা এয়ার শিপমেন্টে পাঠাতে বাধ্য করতে পারেন। এতে রপ্তানি মূল্যের প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ শুধু এয়ার ফ্রেইটে চলে যেতে পারে।
তিনি জানান, গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৯০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। বন্দরের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সমপরিমাণ ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে নতুন অর্ডার অন্য দেশে সরে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, বন্দর শ্রমিকদের সঙ্গে সরকারের বিরোধের মাঝে পড়ে গেছে পোশাক খাত। এ ধরনের সংকটে দ্রুত সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন, কারণ ব্যবসায়ীরা নিজেরা এই সমস্যা সমাধান করতে পারবেন না।
লজিস্টিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার শঙ্কা
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ও বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ইতোমধ্যে পণ্যজট শুরু হয়েছে এবং কিছু দেশ জাহাজ চলাচল স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। বিষয়টি স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সমাধান করা জরুরি।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বন্দর বন্ধ থাকলে পুরো লজিস্টিক ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের মানবসৃষ্ট বিলম্ব বড় ঝুঁকি তৈরি করে এবং এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রমজানের বাজারে প্রভাবের আশঙ্কা
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংকট দীর্ঘ হলে রমজান মাসে নিত্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, বন্দরে পণ্য আটকে থাকায় কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
দ্রুত সমাধানের দাবি
ব্যবসায়ীদের মতে, বন্দর সচল রাখা এবং শ্রমিক অসন্তোষ দ্রুত সমাধান করা সরকারের দায়িত্ব। রপ্তানি কার্যক্রম চালু রাখতে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
কিছু উদ্যোক্তার মত, সামনে নির্বাচন থাকায় এনসিটি ইজারা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় চালান কর্মসূচির বাইরে রাখারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
-পতাকানিউজ

