স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এখনো আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা না হলেও রাজনৈতির মাঠে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় সরকারি দল বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা ইতোমধ্যেই মাঠ সরগরম করে তোলার আয়োজন করছেন।
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের সম্ভাব্য নির্বাচন ঘিরে তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। আইন সংশোধনের ফলে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ, প্রচার এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে মাঠে নেমেছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনের পর্যবেক্ষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় লাভের পর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে আগেভাগেই সংগঠিত হতে শুরু করেছে বিএনপি। জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে স্থানীয় নির্বাচনকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে বিএনপি।
তফসিল না হলেও মাঠে প্রচার-প্রচারণা
নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনো নির্ধারিত না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় ইতোমধ্যেই অনেক এলাকায় নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলার হাট-বাজার, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় এবং জনসমাগমস্থলে পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনে ভরে গেছে দেয়াল। সম্ভাব্য প্রার্থীরা সামাজিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় আয়োজন, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরছেন।
শুধু সরাসরি যোগাযোগেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না তারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সক্রিয় উপস্থিতি বাড়িয়েছেন। ব্যক্তিগত উন্নয়ন পরিকল্পনা, স্থানীয় সমস্যার সমাধান এবং সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে ভোটারদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
দলীয় প্রতীক না থাকার সম্ভাবনায় একই পদে একাধিক আগ্রহী প্রার্থী সামনে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রার্থীরা এখন থেকেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে গণসংযোগ জোরদার করছেন।
কেন্দ্রের বার্তা: ঘোষণার পর পূর্ণ শক্তিতে মাঠে নামবে দল
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে দলের প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে দলীয় প্রস্তুতি রয়েছে এবং তফসিল ঘোষণার পর পূর্ণ শক্তি নিয়ে নেতাকর্মীরা ভোটের মাঠে নামবেন। তার ভাষ্য, ‘এজন্য আলাদা করে মাঠ তৈরি করতে হবে না, নেতাকর্মীরা প্রস্তুত আছেন।’
তিনি মনে করেন, সরকার গঠনের পর অল্প সময়েই বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে জনমনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ভালো ফলের বিষয়ে দল আশাবাদী।
জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন লক্ষ্য স্থানীয় সরকার
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় লাভের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলটির রাজনৈতিক অগ্রাধিকার তালিকায় উঠে আসে। সরকার পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, শিগগিরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন পৌরসভা, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রস্তুতি শুরু করেছেন। অনেকেই ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা ঘোষণাও দিয়েছেন। দেয়ালজুড়ে পোস্টার, ব্যানার এবং এলাকাভিত্তিক সভা-সমাবেশে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন তারা।
তৃণমূলের অভিন্ন সুর
দেশের বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বে থাকা বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যে মিলছে অভিন্ন বক্তব্য। জাতীয় নির্বাচনের পরপরই স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে কাজ শুরু হয়েছে। তাদের মতে, আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নেতারা মনে করেন, আগাম প্রস্তুতি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করে তুলবে। পাশাপাশি দলীয় প্রতীক না থাকায় একই পদে একাধিক প্রার্থী যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না থাকেন, সে বিষয়েও সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে।
কেন্দ্রের নির্দেশনার অপেক্ষায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা
বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল বলেন, দলের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ এলাকায় কাজ করছেন এবং অনেকেই সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তার ভাষায়, ‘অনেকেই আমাদের জানাচ্ছেন তারা নির্বাচনে অংশ নিতে চান। তবে কেন্দ্র থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সবাই সেটিই মেনে নেবেন।’

তৃণমূলের প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ
স্থানীয় পর্যায়েও দেখা যাচ্ছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ। চট্টগ্রামের চকবাজার ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে সম্ভাব্য নেতাদের একজন নাছির উদ্দীন। তিনি বলেন, ‘অতীতে চকবাজার ওয়ার্ডে সুষম উন্নয়ন হয়নি। এখন সুযোগ আছে ওয়ার্ডের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার। এই কারণে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্ধিতার চিন্তা করছি। এলাকায় গণসংযোগ বাড়িয়েছি। তবে সব কিছু নির্ভর করবে দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর।’
সামনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রতীক না থাকার সম্ভাবনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবার আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে। একই দলের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে থাকায় ভোটের সমীকরণ বদলে যেতে পারে। ফলে আগাম প্রস্তুতি ও সংগঠনের শক্তি বাড়ানোই এখন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে তফসিল ঘোষণার আগেই মাঠে সক্রিয় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা। জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের এই আগাম প্রস্তুতি আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও গতিশীল করে তুলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
-পতাকানিউজ

