দীর্ঘদিন দলের রাজনীতি করেছেন। ত্যাগ তিতীক্ষা করেছেন। কিন্তু নির্বাচনের আগ মুহূর্তে দল জানিয়ে দিল, নির্বাচনের টিকেট নেই। টিকেট দেওয়া হয়েছে অন্যের হাতে। তাই অভিমান, ক্ষোভ এবং দ্রোহের আগুন নিয়ে নামলেন নির্বাচনের মাঠে
দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীক কিছুই পেলেন না। মুহূর্তেই প্রতিপক্ষ হয়ে গেল দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠের সহযোদ্ধারা। সহযোদ্ধাদের বেশিরভাগই দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্ত নেতাদের দিকে চলে গেলেন দলীয় আনুগত্য মেনে। কিন্তু দ্রোহের আগুনের লেলিহান শিখা কি আর আনুগত্যের ধার ধারে?
ফলাফল নির্বাচনের মাঠে দলীয় প্রতীকের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ শুরু কররেন ‘স্বতন্ত্র রূপে’। শেষ পর্যন্ত অকূল দরিয়ায় ভেলা ভাসিয়ে পৌঁছে গেলেন জয়ের বন্দরে। এখন তারা নির্বাচন জয়ী বীর। এসব বীরদের প্রতিই আস্থা রেখেছেন ভোটাররা।
ভোটাররা জানতেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হলে এলাকায় উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু সেই আশঙ্কাকে তোড়াইকেয়ার করে ভোটারদের বড় অংশই ঝাপিয়ে পড়লেন বঞ্চিতজনের পাশে। দল বঞ্চিত করলেও ভোটাররা স্বতন্ত্রদের দিয়ে অঢেল।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমন সাতজন প্রার্থী জয় পেয়েছেন যারা দল থেকে মনোনয়ন পাননি। দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত এবং নির্বাচন জয়ী সাতজনই বিএনপির নেতা ছিলেন।
বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিএনপি জোট পেয়েছে ২১২ টি, জামায়াত জোট ৭৭টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি আসনে জয় পেয়েছে। এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ৭ আসনে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২
৭ বিদ্রোহী প্রার্থীর তথ্য পর্যালোচনায়ে দেখা গেছে, এক সময়ের বিএনপির রাজনীতির গণ্ডি যখন ছোট করে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ, সেই সময়ে রাজপথের লড়াকু নারী রুমিন ফারহানা হাঁস প্রতীক নিয়ে ভাসতে ভাসতে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ভোটারা রুমিন ফারহানাকে তো বঞ্চিত করেননি অধিকন্তু ভোটারদের ভালোবাসার কাছে ডুবে গেছেন বিএনপি জোট প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের জুনায়েদ আল হাবিব। রুমিন ফারহানা প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে হারিয়েছেন ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোটে।
টাঙ্গাইল-৩
আরেক বিদ্রোহী টাঙ্গাইল-৩ আসন থেকে সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ জয় পেয়েছেন বিএনপি প্রার্থী ওবায়দুল হক নাসিরকে হারিয়ে। সেখানে বিদ্রোহীর কাছে বিএনপির ধান হেরে যায় প্রায় ২৫ হাজার ১৩২ ভোটের ব্যবধানে।
কিশোরগঞ্জ -৫
কিশোরগঞ্জ -৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনে ধানের শীষ পরাজিত হয়েছে বিদ্রোহীর অনলে পুড়ে। সেখানে বিএনপির বহিষ্কৃত সভাপতি স্বতন্ত্ররূপী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ধানের শীষের সৈয়দ এহসানুল হুদা হেরেছেন ১৩ হাজার ১৫৪ ভোটে।
চাঁদপুর-৪
চট্টগ্রাম বিভাগের চাঁদপুর এক সময় বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানে চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র আব্দুল হান্নান বিজয়ী হয়েছেন। উপজেলা বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হান্নান পেয়েছেন ৭৪ হাজার ১৭৫ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মো. হারুনুর রশিদ। তিনি পেয়েছেন ৬৯ হাজার ১৫৫।
কুমিল্লা-৭
কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদ থেকে বহিষ্কৃত আতিকুল আলম ওরফে শাওন কলস প্রতীকে পেয়েছেন ৯১ হাজার ৬৯০ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রার্থী বিএনপির প্রার্থী রেদোয়ান আহমদ। তিনি পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৫০৯ ভোট। তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী।
ময়মনসিংহ-১
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া) আসনে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা সালমান ওমর। তিনি ১ লাখ ৭ হাজার ২৪১ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ পেয়েছেন ১ লাখ ৭৩৬ ভোট।
দিনাজপুর-৫
দিনাজপুর-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এ জেড এম রেজওয়ানুল হক ১ লাখ ১৪ হাজার ৪৮৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল আহাদ পেয়েছেন ১ লাখ ১০ হাজার ১৯৫ ভোট। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন এ কে এম কামরুজ্জামান। রেজয়ানুল হক বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাঁকে দল বহিষ্কার করে।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে দ্রোহের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া এই ৭ বিদ্রোহীর সঙ্গে এবার দল আপস করে কি না? সেটা এখন দেখার বিষয়।
–পতাকানিউজ

