বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঘিরে বিএনপির ভেতরে অস্বস্তি কাটেনি। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে থাকা নেতাদের সরে দাঁড়াতে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়েছে দলটি। এমনকি বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েও তাদের বড় একটি অংশকে নির্বাচনী মাঠের বাইরে রাখা যায়নি।
ফলে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে যেমন ক্ষোভ বিরাজ করছে, তেমনি ভোট ভাগের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভোটের ভাগের শঙ্কা এতোটাই প্রবল যে, কোনো কোনো আসন বিএনপিকে হারাতে হতে পারেও শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশেষত যেসব আসনে বিএনপি মনোনীত বা জোট প্রার্থীর চেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীর অবস্থান শক্ত, সেসব আসনে বিএনপি জোটকে চড়া মূল্য দিতে হবে পারে।
রাজনীতির মাঠে ভোটের চালচিত্র এবং অন্দরমহলের খোঁজ রাখেন এমন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা পতাকানিউজের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, বিএনপি জোট অনেক আসনেই প্রার্থী বাছাইয়ে দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছে। ফলে এসব আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী বা প্রতিপক্ষ দলের জন্য সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো আসন বিএনপি জোটকে হারাতে হতে পারে -স্বতন্ত্রপ্রার্থীর অবস্থান বাস্তবিক অর্থেই শক্ত হওয়ার কারণে।
গোয়েন্দা সংস্থা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সারাদেশে ৩০০ আসনের মধ্যে অন্তত ৭৫টি আসনে এমন কঠিন সমীকরণের মুখে পড়েছে বিএনপি জোট। আপাতত দৃষ্টিতে বাকি ২২৫ আসনে বিএনপি জোট শুধুমাত্র জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্ধিতা করলেও বাস্তবে সেখানেও বিদ্রোহের ক্ষোভের আগুন কিছুটা হলেও পড়তে পারে। কারণ, পাশের সংসদীয় আসনে যদি বিদ্রোহী প্রার্থীর অবস্থান ভালো হয়, তাহলে সেই আসনের ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে বিএনপিতে ৭৫টি আসনে দলীয় বিদ্রোহী এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটসহ ত্রিমুখী যুদ্ধে নামতে হয়েছে।
বিএনপি সূত্র জানায়, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় অন্তত ৭১ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে বাস্তবে অন্তত ৭৫টি সংসদীয় আসনে বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা সাবেক নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। তাদের অধিকাংশই জোরালো প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন, যা অনেক এলাকায় দলীয় প্রার্থী কিংবা বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে।
দলের ভেতরের আলোচনায় উঠে আসছে, কোথাও কোথাও একাধিক বিএনপি নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবার যেসব আসনে বিএনপি সমমনা বা ভিন্ন দলের প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছে, সেসব জায়গাতেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। কোনো কোনো প্রার্থী এ নিয়ে প্রকাশ্য ক্ষোভও জানিয়েছেন।
নির্বাচন পরিচালনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিএনপির একাধিক নেতা বলছেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা কার্যত বন্ধ করে দেয় দল। তবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা নির্বাচন করছেন তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে এবং এতে দলের কোনো ক্ষতি হবে না। তার ভাষ্য, স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীরা এখন দলীয় বা সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষেই কাজ করছেন।

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। কারণ বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ইতোমধ্যে বড় সমাবেশ ও বক্তব্যের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা প্রকাশ্য সমাবেশে জানিয়েছেন, কেন্দ্র থেকে তাকে নির্বাচন না করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। ওই আসনে বিএনপি সমর্থন দিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি জুনায়েদ আল হাবিবকে।
পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরকে বিএনপি সমর্থন দিলেও সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির হাসান মামুন। এ নিয়ে নুরুল হক নুর প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়ে বলেছেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দুবার আলোচনা করলেও হাসান মামুন সরে দাঁড়াননি।
ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। নির্বাচনী সভায় তিনি বলেছেন, জয়ী হলে আসনটি “তারেক রহমানকে উপহার দেবেন”।
এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ-১ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি রেজাউল করিম খান চুন্নু, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল, নাটোর-৩ আসনে দাউদার মাহমুদ, পাবনা-৪ আসনে জাকারিয়া পিন্টু, শেরপুর-১ আসনে শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে শেখ সুজাত মিয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। এর বাইরে নড়াইল, টাঙ্গাইল ও চান্দিনাসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও ৫৯ জন নেতাকে প্রার্থী হওয়ার কারণে গত ২১ জানুয়ারি বহিষ্কার করা হয়। এই তালিকায় একাধিক সাবেক সংসদ সদস্যও রয়েছেন।
মনোনয়ন না পাওয়া, আবার নির্বাচনেও না দাঁড়ানো—এমন কিছু নেতাকে ঘিরেও উদ্বেগ ছিল দলের মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে। ঢাকায় ববি হাজ্জাজকে দলে এনে মনোনয়ন দেওয়া হলেও ঢাকা-১৩ আসনে সাবেক প্রার্থী সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও তার সমর্থকদের সমর্থন আদায়ে এখনো চেষ্টা চালাতে হচ্ছে। ঢাকা-১৫ আসনে দীর্ঘদিন আলোচনায় থেকেও মনোনয়ন না পাওয়া মামুন হাসানের অনুসারীদের সক্রিয় করাও দলীয় প্রার্থীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, বিএনপির পক্ষ থেকে শক্ত ও স্পষ্ট বার্তা না যাওয়াতেই এত সংখ্যক আসনে নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তার মতে, কিছু এলাকায় জনপ্রিয় নেতাদের মনোনয়ন না দেওয়া এবং শরিক দলকে সমর্থন দিলেও স্থানীয় নেতাদের যথাযথভাবে বোঝাতে না পারার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, বিএনপির ভেতরে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রভাব নিয়ে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এখন দেখার বিষয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা আসন গুলোতে বিএনপি জোট ত্রিমুখী লড়াই করে কতোটা সাফল্য দেখাতে পারে রাজনীতির মাঠে।
-পতাকানিউজ

