জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬-এর কয়েকটি ধারায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ইতিবাচক সংশোধনী প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও দুটি বিলেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত তদন্তের ক্ষেত্রে মৌলিক ঘাটতি রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
বিশেষ করে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনভাবে তদন্ত করার ক্ষমতা না থাকায় তদন্তের কর্তৃত্ব কার্যত অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের হাতেই থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
বিল দুটি চূড়ান্তভাবে পাসের আগে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা নিয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সব সদস্যের অর্থবহ আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম প্রেরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলে আদিবাসী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বাধ্যবাধকতা, ঋণখেলাপি ব্যক্তিকে কমিশনার হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা এবং সামরিক বাহিনী ছাড়া অন্য আটককেন্দ্র পরিদর্শনে পূর্বানুমোদনের শর্ত বাদ দেওয়ার মতো কয়েকটি সংশোধনীকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে টিআইবি।
তবে এসব ইতিবাচক পরিবর্তনের পরও কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে বলে মনে করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘কমিশন সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগে আওতাধীন হবে না-এমন সুস্পষ্ট বিধান না রাখা; চাকরিরত সরকারি কর্মচারীকে প্রেষণ, লিয়েন বা অবৈতনিক ছুটিতে কমিশনার হওয়ার সুযোগ; বাছাই কমিটিতে স্পিকার, দুই মন্ত্রী, সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ তথা ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র প্রভাবের ঝুঁকি; কমিশনের মোট জনবলের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি কর্মচারী প্রেষণে নিয়োগ; এবং কমিশনের ব্যয় ও বরাদ্দ ব্যবহারে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক স্বাধীনতার সুরক্ষা না রাখার ফলে স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের প্রত্যাশা অধরাই থাকছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অর্থাৎ, কমিশন গঠন হচ্ছে, কিন্তু তা স্বাধীন হওয়ার আশা দুরাশাই রয়ে যাচ্ছে। একইভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের কর্তৃত্ব কার্যত অভিযুক্তের হাতেই থাকছে।’
জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইউনিটের নিয়মিত ও পূর্বঘোষণা ছাড়া পরিদর্শনযোগ্য স্থানের তালিকা থেকে ‘সামরিক আটককেন্দ্র’ বাদ থাকাও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
একই সঙ্গে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তাঁর পক্ষে আইনি সহায়তা, মানবাধিকারবিষয়ক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলের সঙ্গে আইনের সামঞ্জস্য পরীক্ষা এবং মানবাধিকার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাজের মতো কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি প্রস্তাবিত বিলে সংকুচিত করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
গুম প্রতিরোধ বিলেও তদন্ত নিয়ে উদ্বেগ
টিআইবি বলছে, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের ধারা ৪-এর লিখন পুনর্বিন্যাস ছাড়া স্বাধীন তদন্ত, জবাবদিহি বা ভুক্তভোগীর অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যত কোনো মৌলিক সংশোধনের সুপারিশ করেনি সংসদীয় কমিটি। এ কারণে জবাবদিহির মূল কাঠামোর ক্ষেত্রে কমিটির সংশোধনী সুপারিশগুলো অনেকটাই ‘কসমেটিক’ বলে মন্তব্য করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের ধারা ১৯-এ শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে কমিশন নিজে সরাসরি অনুসন্ধান ও তদন্ত না করে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানটির কাছেই প্রতিবেদন চাইবে—এই মূল ব্যবস্থা বহাল রয়েছে।’
তাঁর মতে, কমিশনের অনুসন্ধান ও তদন্তের এখতিয়ার সংকুচিত করে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদননির্ভর করার ফলে এই বিধান ২০০৯ সালের আইনের তুলনায়ও দুর্বল এবং প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
একই ধরনের সংকট গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলেও রয়েছে বলে মনে করছে টিআইবি। সংস্থাটির ভাষ্য, বিলের ১৪(৩) ধারায় অভিযুক্ত বাহিনীকে নিজ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত থেকে বিরত রাখা হলেও অন্য শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের হাতে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অথচ অতীতে অধিকাংশ গুমের ঘটনায় বিভিন্ন শৃঙ্খলা, পুলিশ, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। ফলে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান সেই একই ন্যায়বিচার-প্রতিরোধক প্রাতিষ্ঠানিক বলয় থেকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন বলে মন্তব্য করেন ড. জামান।
তিনি বলেন, ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবে দুর্বল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত শুধু ন্যায়বিচারকেই ব্যাহত করবে না; এর ফলে ভুক্তভোগী গুমের শিকার হিসেবে স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ এবং তাঁর পরিবারের সম্পত্তি ব্যবহার ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন।’
গুমের সংজ্ঞা ও শাস্তি নিয়ে প্রশ্ন
গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ (আইসিপিপিইডি)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গুমের সংজ্ঞা আরও পূর্ণাঙ্গ করার দাবি জানিয়েছে টিআইবি।
ড. জামান বলেন, ‘সরকারি কর্মচারী ও শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রভাবশালী মহলের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাও সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।’
একই সঙ্গে বিলের ১৫ ধারায় অধস্তন তদন্তকারীর অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে কার্যধারা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের বিধান বাস্তবে অভিযুক্তদের ঢালাও দায়মুক্তির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া, ১৬ ধারায় গুমের শিকার ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া বা তাঁর পরিণতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা এবং পরিবারকে নিয়মিত অগ্রগতি জানানোর যে সুরক্ষা ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে ছিল, তা প্রস্তাবিত বিলে রাখা হয়নি বলেও অভিযোগ করেছে টিআইবি।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় গুমসংক্রান্ত অপরাধের সাজা কমানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। টিআইবির দাবি, গুমের অপরাধের ন্যূনতম সাজা তিন বছর হলেও ‘মিথ্যা বা হয়রানিমূলক’ অভিযোগের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
ড. জামান বলেন, ‘তদন্ত ব্যবস্থাই যখন স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের ঝুঁকিতে রয়েছে, তখন যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে প্রকৃত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার দায় উল্টো অভিযোগকারী পরিবারের ওপর বর্তানোর আশঙ্কা রয়েছে। এমন বিধান ভুক্তভোগীদের অভিযোগ জানানো ও ন্যায়বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুতর ভীতির সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে পারে।’

তড়িঘড়ি পাস না করার আহ্বান
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিষয়ে খসড়া প্রণয়ন পর্যায় থেকেই টিআইবির পর্যবেক্ষণ এবং মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদনের পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে ২৫ দফা ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে ১৭ দফা সুপারিশ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন ড. জামান।
তিনি বলেন, ‘সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনা ছিল বিল দুটির মৌলিক দুর্বলতা সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু অংশীজনদের বারবার তুলে ধরা মূল কৌশলগত উদ্বেগগুলো বহাল রয়েছে।’
বিল দুটি তড়িঘড়ি কণ্ঠভোটে পাস না করে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি ধারা ও প্রস্তাবিত সংশোধনীর ওপর সংসদের সব সদস্যের অর্থবহ আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের আহ্বান জানান তিনি।
ড. জামান বলেন, ‘প্যারিস নীতিমালা, আইসিপিপিইডিসহ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, ভুক্তভোগীদের অধিকার এবং অংশীজনদের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রতিফলিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পরে বিল দুটি পাস না হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ দেশে মানবাধিকার সুরক্ষায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার জন্য দায়ী থাকবে।’
-সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

