চাঁদাবাজির অভিযোগে স্থগিত থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন (বৈছাআ) হঠাৎ করেই আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রায় তিন মাস স্থবির থাকার পর গত রবিবার সংগঠনটির সভাপতি রিফাত রশিদের স্বাক্ষরিত এক ঘোষণায় সব কমিটির স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া হয়। অথচ জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিজেরাই এসব কমিটি বাতিল করেছিলেন চাঁদাবাজির অভিযোগে। হঠাৎ এই ইউটার্নে সংগঠনের ভেতর তীব্র ক্ষোভ ও বিভাজন দেখা দিয়েছে।
সংগঠনটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাতীয় ছাত্রশক্তির নতুন কমিটি ঘোষণার পর থেকেই বৈছাআর শীর্ষ পর্যায়ে অনৈক্য তৈরি হয়। কিছুদিন ধরেই আলোচনা ছিল, রিফাত রশিদ ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে পারেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেটি হয়নি। ফলে সংগঠনের ভেতরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। পরে কেন্দ্রীয়ভাবে বৈছাআর সব কমিটি আবার সচল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাসান ইনামের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘোষণার মাত্র এক ঘণ্টা পরই তিনি পদত্যাগ করেন। তাঁর পরপরই সাতজন শীর্ষস্থানীয় নেতা পদ ছাড়েন।
সংগঠনের কয়েকজন সাবেক নেতা জানিয়েছেন, যে সব কমিটি চাঁদাবাজির অভিযোগে স্থগিত হয়েছিল, তাদের আবার কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনা সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে। এক পদত্যাগী নেতা বলেন, “চাঁদাবাজির ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তাদের পুনর্বহাল মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া।”
রিফাত রশিদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “জুলাইয়ের অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে তোলা। সে লক্ষ্যে দেশের সব ইউনিট কমিটির কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তবে সংগঠনের ভেতরের অনেকে মনে করছেন, এই ঘোষণার পেছনে ছাত্রশক্তির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব কাজ করেছে। বাগছাসের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আব্দুল কাদেরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তেও ক্ষোভ ছিল একটি অংশে, যা শেষ পর্যন্ত বৈছাআর পুনর্বহালের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
ঘোষণার পর পরই পদত্যাগ করেন সাধারণ সম্পাদক শেখ ইনামুল হাসান (হাসান ইনাম), সহ-দপ্তর সম্পাদক সিয়াম আন নুফাইস, শাবিপ্রবির সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম, ফরিদপুর জেলার মুখপাত্র কাজী জেবা তাহসিন, কুড়িগ্রামের মুখ্য সংগঠক সাদিকুর রহমান, লক্ষ্মীপুরের যুগ্ম আহ্বায়ক রেদওয়ান হোসাইন রিমন এবং কুমিল্লার আবু হানিফ।
হাফিজুল ইসলাম তাঁর পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, ‘যে উদ্দেশ্যে সংগঠনটি শুরু হয়েছিল, সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে তা আর প্রতিফলিত হচ্ছে না।’
জেবা তাহসিন ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানান, ‘আমি পদ ছাড়ছি, কিন্তু বৈষম্যবিরোধী সমাজের স্বপ্ন থেকে নয়।’
রেদওয়ান রিমন তাঁর পোস্টে আরও তীব্র ভাষায় লিখেছেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন সংগঠন নয়। কিন্তু একদল এখন এটিকে রাজনৈতিক দলের পাদানিতে নামিয়ে আনছে।’
বৈছাআর একাধিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ের সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে মূল কারণ নেতৃত্বের অবস্থান ধরে রাখা। জাতীয় ছাত্রশক্তির নতুন কমিটিতে প্রত্যাশিত পদ না পেয়ে সংগঠনের একটি অংশ নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে বৈছাআর কমিটিগুলো পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তে যায়। এতে একদিকে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে, অন্যদিকে সমালোচনা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, একসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিকল্প ছাত্ররাজনীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু এখন তার ভেতরে এমন দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে, যা সংগঠনটির ভবিষ্যৎ অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
পদত্যাগের পর অনেক ইউনিটেই কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। পুনর্গঠনের সময়সীমা ১৫ কার্যদিবস বেঁধে দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের নেতারা বলছেন, ‘নতুন কমিটি নয়, এখন দরকার বিশ্বাস পুনরুদ্ধারের।’
সংগঠনের এক সিনিয়র সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যেভাবে সিদ্ধান্তগুলো একতরফাভাবে নেওয়া হচ্ছে, এতে মনে হয় না বৈছাআ তার পুরোনো সত্তা ধরে রাখতে পারবে।’
পতাকানিউজ/এনটি

