অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদে সরে যাওয়ার পথ খুঁজছেন— জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতাদের এমন অভিযোগ নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই বক্তব্যের পেছনে কী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আর কেন আন্দোলনের অংশীদাররাই এখন সরকারের সমালোচনায়— এসব প্রশ্নে সরগরম দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল।
গত সপ্তাহে এক বেসরকারি টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাৎকারে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রথম এই প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছেন এবং নিজেদের জন্য ‘সেফ এক্সিট’-এর পথ খুঁজছেন। পরে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমও একই বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করেন।
দুজনই কোনো নাম উল্লেখ না করলেও, তাদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এনসিপি।
আন্দোলনের সহযোগী থেকে সমালোচক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় মূলত ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে। তখন নাহিদ ইসলামসহ তিনজন তরুণ নেতা সরকারে উপদেষ্টা পদ পান।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ‘গণআন্দোলনের ঐক্য’ যেন দুর্বল হয়ে পড়েছে। এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা দাবি করছেন, সরকারের কিছু উপদেষ্টা বিএনপি ও জামায়াত ঘনিষ্ঠ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েছেন। এর ফলে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, আর এখান থেকেই ‘সেফ এক্সিট’ বিতর্কের জন্ম।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও সাবধানী অবস্থান
গত বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সরাসরি কোনো জবাব দেননি। তবে তিনি বলেন, নাহিদ ইসলামের বক্তব্যটা স্পষ্ট নয়। তিনি যদি প্রমাণসহ কথা বলেন, তখন সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া দেওয়া যেতে পারে।
এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, সরকার এখনো বিষয়টিকে ‘গুরুতর অভিযোগ’ হিসেবে নিতে চাইছে না। তবে অভিযোগের প্রকৃতি এমন যে, উপদেষ্টা পরিষদের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ইঙ্গিতও এর ভেতর থেকে প্রকাশ পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ‘সেফ এক্সিট’ প্রসঙ্গ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন। যদি এখন সেই দায়িত্বে অনীহা দেখা যায়, তাহলে সেটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হবে।
তার মতে, ‘সেফ এক্সিট’ শব্দটি সাধারণত তখনই আসে, যখন ক্ষমতাসীনদের মধ্যে আত্মরক্ষার মনোভাব তৈরি হয়। ফলে এই বিতর্ক সরকারের ভেতরে আস্থার সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
নির্বাচনের আগে নতুন সংকেত
আগামী ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন। সেই প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক যেন নতুন এক অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনআস্থার প্রশ্ন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যাদের হাত ধরে এই সরকার এসেছে, তারাই যদি প্রশ্ন তোলে, তবে ভোটের আগে রাজনৈতিক ভারসাম্য আরও নড়বড়ে হয়ে পড়বে।
শেষ কথা
‘সেফ এক্সিট’ বিতর্ক আপাতত ব্যক্তিগত অভিমত হিসেবে দেখা হলেও, এর ভেতরে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ইঙ্গিত। আন্দোলনের প্রতিনিধি হিসেবে উঠে আসা তরুণদের হতাশা, সরকারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং নির্বাচনপূর্ব অনিশ্চয়তা— সবকিছু মিলেই এই প্রশ্নকে এখন কেন্দ্রীয় আলোচনায় পরিণত করেছে।
পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে অভিযোগগুলোর প্রমাণ ও সরকারের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
পতাকানিউজ/এআই

