ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ শুরু করেছেন। ১৫ টি মার্কিন জাহাজ অবরোধ কার্যকর করতে কাজ শুরু করেছে। ইরান এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া বার্তা দিয়েছে, এর করুণ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
ট্রাম্প যখন ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ শুরু করেন, তখন ন্যাটোকে পাশে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্পষ্টভাবে জানিয়েছে দিয়েছে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে তারা হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের অবরোধে অংশ নেবে না। ফলে চরম বেকায়দায় পড়েছেন ট্রাম্প। কারণ, নিজ দেশে তার বিরুদ্ধে মানুষ সোচ্চার হচ্ছেন। আবার বিশ্বে তিনি ক্রমেই মিত্রহীন হয়ে পড়ছেন। যদিও অনেক দেশ চুপ থেকে ট্রাম্পকে কিছু বলছেন না, তারপরও আকারে ইঙ্গিতে ঠিকই বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ট্রাম্প সঠিক পথে নেই।
১৫ জাহাজ দিয়ে অবরোধ শুরু
সোমবার থেকে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে ১৫টি মার্কিন জাহাজ অংশ নিচ্ছে। অবরোধ শুরুর পর ট্রাম্প হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের কোনো জাহাজ অবরোধে আক্রমন করতে এলে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
এদিকে অবরোধ শুরুর পর ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির সহযোগী সংস্থা ‘ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর পাশাপাশি পারস্য উপসাগর, ওমান সাগরের উপকূলীয় এলাকা এবং আরব সাগরের কিছু অংশে নৌ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
সময়ে সময়ে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাম্প যেভাবে পোস্ট দেন, সোমবারও এর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। তিনি হুমকি দিয়ে লিখেছেন, যেভাবে মাদক চোরাচালানকারীদের ওপর যেভাবে হামলা চালানো হয়েছে, সেভাবে ইরানের জাহাজগুলোর ওপর হামলা চালানো হবে। তিনি বলেছেন, ‘সমুদ্রে নৌকায় থাকা মাদক ব্যবসায়ীদের নির্মূল করতে আমরা যে পদ্ধতি ব্যবহার করি, সেই পদ্ধতিতে তাদের (ইরানি জাহাজ) নিশানা করা হবে।’
ট্রাম্পের এমন হম্বিতম্বির মধ্যেই ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে উচ্চারণ করেছে, তাদের বন্দরগুলো হুমকির মুখে পড়লে পারস্য উপসাগর বা ওমান সাগরের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।
ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফারসে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী বলেছে, হরমুজ প্রণালির দিকে সামরিক জাহাজ অগ্রসর হলে সেটিকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেবে তারা।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আকস্মিক হামলা চালায়। প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে হত্যা করে। এরপর টানা ৪০ দিন যুদ্ধ করে ইরান। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প যুদ্ধ বিরতি চুক্তি করতে মরিয়া প্রচেষ্টা চালান এবং পাকিস্তানকে সামনে রেখে দুই সপ্তাহের যুদ্ধ বিরতি চুক্তি করেন। এখন যুদ্ধ বিরতির সময়ে ট্রাম্প পুনরায় ইরানের বন্দর অবরোধ শুরু করলেন। মূলত ইরানকে বসে আনতে ব্যর্থ হয়ে ট্রাম্প হম্বিতম্বি করছেন।

ট্রাম্পকে ন্যাটোর ‘না’
হরমুজ প্রণালি অবরোধ বাস্তবায়নে ন্যাটোকে পাশে চেয়েছিলেন মিত্রবাহিনী ন্যাটোকো। কিন্তু ট্রাম্পের চাওয়ার কথা শুনেই সরাসরি ‘না’ বলেছে ন্যাটো। এতে ট্রাম্প ন্যাটো থেকে দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের ধাক্কা খেলেন। এমন চরম অপমানজনক পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে নিকট অতীতে পড়তে হয়নি। এখন ট্রাম্প চরম বেকায়দায় আছেন। কারণ, ইরানে অবরোধ বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে একা যুক্তরাষ্ট্রকেই। মিত্র নেই পাশে। মিত্র না থাকা মানে, বাকি বিশ্ব ধরেই নিচ্ছে ট্রাম্প নিজের খেয়ালখুশি মতো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং যুদ্ধ বিরতি লঙ্ঘন করে চলেছেন। একমাত্র ইসরায়েল ছাড়া ট্রাম্পকে এই যুদ্ধে আরও কেউ সমর্থন দিচ্ছে না বললেই চলে। অবশ্য, এই যুদ্ধে ট্রাম্পকে টেনে এনেছে ইসরায়েল। এখন যুক্তরাষ্ট্র তার ভান্ডার খালি করে ইরানে বোমা মারছে আর ইসরায়েল নিজের স্বার্থ উদ্ধার করছে।
ন্যাটোর কাছে ট্রাম্প চেয়েছিলেন, মিত্র দেশগুলোও এই সামুদ্রিক অবরোধে তার সঙ্গে যোগ দিক। কিন্তু ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে তারা এই প্রক্রিয়ায় জড়াবে না।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ব্রিটেনের ওপর যথেষ্ট চাপ থাকলেও তারা এই মুহূর্তে এই যুদ্ধের অংশ হতে চান না। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা এই নৌ-অবরোধ সমর্থন করছেন না। ব্রিটেনের পাশাপাশি জার্মানি, স্পেন, ইতালি, পোল্যান্ড এবং গ্রিসও এই অভিযানে নৌবাহিনী পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মিত্র দেশগুলোর এমন অবস্থানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে ন্যাটো ভেঙে দেওয়ার কিংবা ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্র বের হয়ে যাবে এমন ঘোষণা দিতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এক ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি জানান, ফ্রান্স ব্রিটেন ও অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে মিলে একটি বহুজাতিক মিশন গঠনের পরিকল্পনা করছে, যার উদ্দেশ্য হবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা।
ম্যাক্রোঁ স্পষ্ট করেছেন যে এটি কোনো আক্রমণাত্মক অভিযান হবে না, বরং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা কেবল আত্মরক্ষামূলক ও শান্তি রক্ষার কাজে অংশ নেবে। এই সিদ্ধান্তটি ট্রাম্পের সরাসরি সংঘাতের নীতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
কারণ, ইরান চাইছে হরমুজ পাড়ি দিতে হলে টোল দিতে হবে। সেই টোল যদি ইরান আদায় করা শুরু করে তাহলে ইরান বিপুল অর্থ আয় করতে পারবে এবং যুদ্ধের ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারবে বলে ইরান আশা করছে। কিন্তু ট্রাম্প চাচ্ছেন, ইরান হরমুজ প্রণালী থেকে কোনো ধরনের টোল নিতে পারবে না। কারণ, ইরান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হোক সেটা ট্রাম্প কখনোই চান না। এই কারণেই ক্ষোভ থেকে ট্রাম্প ইরানের বন্দর অবরোধ শুরু করেছেন। যে অবরোধে ন্যাটোসহ বন্ধু রাষ্ট্রকে সঙ্গে পাননি ট্রাম্প। ফলে অবরোধ শুরু করলেও ট্রাম্প এখন চরম বেকায়দায় আছেন বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
তথ্য সূত্র : আল জাজিরা ও দ্যা গার্ডিয়ান
-পতাকানিউজ

