ইরানের সঙ্গ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা কিংবা চুক্তির জন্য কূটনৈতিক আলোচনা – দুই মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের কোণঠাসা অবস্থা ক্রমেই প্রকাশ পাচ্ছে। হরমুজ প্রণালী যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ করে রেখেছে। সেই অবরোধ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেন আর পারছে না। এই কারণে মিত্রদের পাশে চাইছে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ট্রাম্প হয়তো মিত্রদের বুঝাতে চাইছেন, ‘আমি একা পারছি না। বা আমেরিকা একা পারছে না। বন্ধুরা, আসো, হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে ইরানকে পরাজিত করার সর্বাত্মক লড়াই চালাই।’
যুক্তরাষ্ট্রের এমন তৎপরতা ফাঁস হয়েছে একটি তার বার্তায়। মজার বিষয় হলো, এই জোটে রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশকে বাদ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে নতুন একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনে তৎপর হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে ‘মেরিটাইম ফ্রিডম কনস্ট্রাক্ট’ (এমএফসি) নামে প্রস্তাবিত এই জোটে যোগ দিতে মিত্র দেশগুলোর ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে বিশ্বজুড়ে তাদের দূতাবাসগুলোতে পাঠানো এক গোপন বার্তায় (ক্যাবল) জোট গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে মিত্র দেশগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তাদের অংশগ্রহণের বিষয়ে অবস্থান জানাতে বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং দ্যা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ওয়াশিংটন দ্রুত সমর্থন নিশ্চিত করতে জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
প্রস্তাবিত জোটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সাম্প্রতিক সময়ে এ অঞ্চলে একাধিক তেলের ট্যাংকারে হামলা, জাহাজ আটক এবং পাল্টাপাল্টি উত্তেজনার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়েছে, বেড়েছে তেলের দাম এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
জোট পরিচালনায় মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও পেন্টাগন যৌথভাবে কাজ করবে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ রয়েছে। তবে এতে রাশিয়া, চীন, বেলারুশ ও কিউবার মতো দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা এই উদ্যোগকে কৌশলগতভাবে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী দেশগুলো তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী অবদান রাখতে পারবে। এর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান, কূটনৈতিক সমন্বয়, নজরদারি কার্যক্রম কিংবা সরাসরি নৌবাহিনী মোতায়েনের মতো পদক্ষেপ থাকতে পারে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স পৃথকভাবে এ অঞ্চলে নিজেদের নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট গঠনের উদ্যোগ কেবল সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মাধ্যমে ইরানের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইউরোপীয় দেশগুলো এই উদ্যোগে কতটা সক্রিয়ভাবে সাড়া দেবে, তা এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে। অনেক দেশই একদিকে নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনা করছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়ার ঝুঁকিও হিসাব করছে।
এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন এক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে যখন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া বার্তা দিয়েছে, তখনই যুক্তরাষ্ট্র একা না লড়ে মিত্রদের পাশে চাইছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এখন হয়তো যুক্তরাষ্ট একা যুদ্ধ না করে মিত্রদের যুদ্ধের মাঠে আনতে চাইছেন। কারণ, ইতোমধ্যেই ইরান হুমকি দিয়ে বলেছে, অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে বা চলমান থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলোকে নিশানা বানানো হবে।
তথ্যসূত্র : সিএনএন
-পতাকানিউজ

