যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অতর্কিতভাবে ইরানে হামলার পর পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। তিন দেশের এই হামলা-পাল্টা হামলার আঁচ ইতোমধ্যেই পুরো মধ্যে প্রাচ্যে পড়েছে। এবার সেই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই জ্বালানিখাতে যুদ্ধের আঁচ ভোগ করতে শুরু করেছে। এবার মরার ওপর খরার ঘা হয়ে আসছে বাণিজ্যিক জাহাজে কনটেইনারের ওপর বাড়তি সারচার্জ। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। ফলে শিপিং কম্পানিগুলোকে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে দূরপথ ঘুরে। এমন পরিস্থতিতে বাড়ছে পরিবহন ব্যয়। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের ওপর।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাড়তি খরচ সামাল দিতে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো কনটেইনার পরিবহনে নতুন করে সারচার্জ আরোপ শুরু করেছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের শিপিং খাত, আমদানি–রপ্তানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে—এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিপিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে পণ্য পরিবহনের বুকিং আপাতত স্থগিত রেখেছে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি। তবে যেসব কনটেইনার ইতোমধ্যে বন্দরে অবস্থান করছে বা জাহাজে তোলা হয়েছে, সেগুলোর ওপর নতুন করে সারচার্জ আরোপ করা হচ্ছে।
বর্তমানে ১৪ টন ধারণক্ষমতার একটি কনটেইনার পরিবহনে ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। আর হিমায়িত পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত বড় ‘রেফার’ কনটেইনারের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত খরচ প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত ধরা হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, যুদ্ধাবস্থার কারণে সমুদ্রপথে চলাচল করা জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে একাধিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, যুদ্ধঝুঁকির কারণে ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ বাড়ানো, নাবিকদের নিরাপত্তা এবং বিকল্প বা ঘুরপথে পণ্য পরিবহনের প্রয়োজন—সব মিলিয়ে শিপিং কোম্পানিগুলোর খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো সাধারণত অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ করে থাকে। এখন যে সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সেটি বাড়তেও পারে। আবার সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এই বাড়তি খরচ দীর্ঘ সময় ধরে বহাল থাকার সম্ভাবনাও আছে।’
একই সঙ্গে তিনি জানান, বর্তমানে অনেক শিপিং কোম্পানি মধ্যপ্রাচ্যগামী রুটে নতুন বুকিং না নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় এই অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য—যেমন গামছা, মুড়ি, বিস্কুট, শাকসবজি, মাছ কিংবা সুপারি—বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত কনটেইনারে করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাঠানো হয়। এসব পণ্যের একটি অংশ আকাশপথেও রপ্তানি করা হয়।
খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক নিত্যপণ্য বাংলাদেশ থেকেই যায়। সমুদ্রপথে যদি পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, তাহলে সেই প্রভাব রপ্তানি খাতে পড়বে।’
তবে এই সারচার্জ শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়; গন্তব্যভেদে প্রায় সব দেশের ক্ষেত্রেই একই ধরনের অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিপিং খাত সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, বাংলাদেশে কনটেইনার পরিবহনের বাজারে কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডেনমার্কের মায়ের্সক লাইন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি), ফ্রান্সের সিএমএ–সিজিএম এবং জার্মানির হ্যাপাগ–লয়েড।
ইতোমধ্যে এসব কোম্পানির কয়েকটি মধ্যপ্রাচ্যমুখী পণ্য পরিবহনে বাড়তি সারচার্জ ঘোষণা করেছে। ফরাসি শিপিং কোম্পানি সিএমএ–সিজিএম গত ৩ মার্চ জানায়, মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের ১৩টি দেশে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ‘ইমার্জেন্সি কনফ্লিক্ট সারচার্জ’ আরোপ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি আরব উপসাগরমুখী চালানে প্রতি কনটেইনারে ৮০০ ডলার বাধ্যতামূলক সারচার্জ নির্ধারণ করেছে। ডেনমার্কের মায়ের্সক লাইন উপসাগরীয় সাতটি দেশে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রতি কনটেইনারে ১ হাজার ৮০০ ডলার পর্যন্ত জরুরি ভাড়া ঘোষণা করেছে। আর জার্মানির হ্যাপাগ–লয়েড প্রতি কনটেইনারে ১ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত যুদ্ধঝুঁকি সারচার্জ আরোপ করেছে।
শিপিং খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সমুদ্রে আটকে পড়া বা ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে থাকা আরব উপসাগরমুখী কিছু জাহাজকে কাছাকাছি নিরাপদ বন্দরে খালাস করার পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। এতে জাহাজ পরিচালনা ও পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হবে, যা সামাল দিতেই শিপিং কোম্পানিগুলো সারচার্জ আরোপ করছে।

হরমুজ প্রণালি কেন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যের বড় একটি অংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে সম্পন্ন হয়। এই প্রণালি দিয়ে ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের সঙ্গে পণ্য পরিবহন করা হয়।
লোহিত সাগর হয়ে সৌদি আরবের কিছু অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের বিকল্প পথ থাকলেও উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে কার্যত বিকল্প কোনো রুট নেই।
খায়রুল আলম সুজন বলেন, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক মেরিটাইম খাতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। যদি ইরানের সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী এ সংঘাতে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে লোহিত সাগর এড়িয়ে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে ইউরোপ ও আমেরিকায় যেতে হতে পারে। এতে সময় যেমন বাড়বে, তেমনি পরিবহন ব্যয়ও অনেক বেশি হয়ে যাবে, বলেন তিনি।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ওই অঞ্চলে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
আমদানির বড় অংশ জ্বালানি, সার ও খনিজজাত পণ্য কার্গো জাহাজে এলেও শিল্পের কাঁচামালসহ অনেক পণ্য কনটেইনারে পরিবহন করা হয়।
অন্যদিকে রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শাকসবজি, ফলমূল, হিমায়িত মাছ, ক্যাপ ও জুতা।
রোদ, ঝড়, বৃষ্টি কিংবা সমুদ্রের ঢেউ থেকে পণ্যকে সুরক্ষিত রাখতে এসব পণ্য সাধারণত কনটেইনারে করেই পরিবহন করা হয়। ফলে সমুদ্রপথে সারচার্জ বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে পণ্যের দাম ও বাণিজ্য ব্যয়ের ওপর—বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরো পড়ুন :
-পতাকানিউজ

