বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত ইরানের হাতেই থাকতে পারে। ওমানের সঙ্গে প্রস্তাবিত একটি চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করা জাহাজগুলোর ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে তেহরান।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে তা ইরানের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে খুব দ্রুতই সমঝোতা হতে যাচ্ছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার বলে আসছেন, বিশ্বের অতি গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে তাঁরা কখনোই রাজি হবেন না।
প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে বিবেচিত হবে। যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব জাহাজ অবাধে চলাচল করত এবং এ জন্য কোনো ফি দিতে হতো না।
ইরান-ওমান আলোচনায় অগ্রগতি
বৃহত্তর কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছে। প্রণালিটির উত্তর অংশ ইরান এবং দক্ষিণ অংশ ওমানের নিয়ন্ত্রণে।
ইরান জানিয়েছে, আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরে প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য জাহাজগুলোকে ইরানের জলসীমা ব্যবহার করতে হবে।
তবে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন ইরানি ও আঞ্চলিক সূত্রগুলো। একই সঙ্গে তাঁরা ট্রাম্পের এ দাবির সঙ্গেও একমত নন যে খুব শিগগির হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তি হয়ে যাবে।
আঞ্চলিক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কোনো না কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার বিষয়ে ইতিমধ্যে ছাড় দেওয়া হয়েছে।’
আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘তবে নিয়ন্ত্রণ বলতে ঠিক কী বোঝানো হবে, সেটি এখনো নির্ধারিত হয়নি। উপসাগরীয় দেশগুলো চাইছে, জাহাজ তল্লাশির দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোর হাতে থাকুক এবং কোনো ফি আদায় করা হলে তা যেন বাধ্যতামূলক না হয়।’
জাহাজ থেকে ৫ থেকে ৭ শতাংশ ফি চায় ইরান
আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে ফি আদায়। ইরানের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে বহন করা পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি আদায় করতে চায়। ওমান প্রায় ৩ শতাংশ ফি প্রস্তাব করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের ফি আরোপের বিরোধিতা করছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকবে। তবে উপসাগর থেকে বের হওয়া জাহাজের ক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকা কী হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত বিষয়।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে বলেন, ‘এ ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ উপসাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় ইরানের জলসীমা ব্যবহার করে।’ তিনি আরও বলেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনায় মৌলিক সমঝোতা হয়েছে এবং তা এখন চূড়ান্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
ঘারিবাবাদি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছে যে জুনের মাঝামাঝি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিতে তারা পুরোপুরি ফিরে যেতে প্রস্তুত। ওই সমঝোতায় সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করার কথা ছিল।
হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার জন্য এটিকে অন্যতম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন ঘারিবাবাদি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনা হয়নি বলেও জানান তিনি।
উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সতর্কবার্তা
কূটনৈতিক আলোচনা চললেও একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, তার ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে পুরো অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালানো হবে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে সামরিক হামলা থেকে বিরত রাখতেই ইরান এমন বার্তা দিচ্ছে। একটি উপসাগরীয় দেশের এক সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, ‘ইরানের বার্তা ছিল একেবারে স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অবকাঠামোয় হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানবে তারা।’
বর্তমানে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে তেহরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে।
কূটনৈতিক সমাধান চান ট্রাম্প
এদিকে লাস ভেগাসে এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এখনো কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি চুক্তি করতে চাই। কারণ, আমি মানুষ হত্যা করতে চাই না। কিন্তু একটা সময় হয়তো সেটি করতেই হবে।’ ইরানের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করার পর ইরানে ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, যুদ্ধে তাদের ১৮ জন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্পের ওপর বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে এ যুদ্ধ শেষ হবে। এমনকি দেশটির নেতৃত্ব কে দেবেন, সেটিও যুক্তরাষ্ট্র ঠিক করবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনমতের বিরোধিতার মুখে এখন ট্রাম্পের ওপর সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার চাপ বাড়ছে।
জুলাইয়ে টানা দুই সপ্তাহের বিমান হামলাসহ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক অভিযানই হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে পারেনি। এর পাশাপাশি মার্কিন সেনা কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, দূরপাল্লার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে।
গত মঙ্গলবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় পুরো মজুতই ব্যবহার করে ফেলেছে।
ফলে যুদ্ধের শুরুতে ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের কথা বলা ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সমাধানের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে যে সমঝোতার আলোচনা চলছে, তাতে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকার সম্ভাবনাই সামনে আসছে।
তথ্যসূত্র : রয়টার্স
-পতাকানিউজ

