মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক অনিশ্চয়তায় পড়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আশ্বাস দিয়েছে ইরান। দেশটি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলে তারা বাধা দেবে না।
জ্বালানী মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জ্বালানি সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয় সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশ সরকার ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে। ওই যোগাযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইরান ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে এবং বাংলাদেশের তেল ও এলএনজি বহনকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। এতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে তাৎক্ষণিক যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কূটনৈতিক যোগাযোগে ইতিবাচক বার্তা
সোমবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহীমি জাহানাবাদীর বৈঠকে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি, জ্বালানি পরিবহন ঝুঁকি এবং বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে কিছু নির্দিষ্ট দেশের জাহাজের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে সে ধরনের বাধা দেওয়া হবে না। তবে একটি শর্তের কথা জানানো হয়েছে—বাংলাদেশের জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের আগেই তার তথ্য ইরানকে জানাতে হবে। এতে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে তারা মনে করছে।
বন্দরে পৌঁছাচ্ছে নতুন তেলবাহী জাহাজ
সরকারি আশ্বাসের পাশাপাশি দেশের জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে আমদানিও চলছে নিয়মিত। ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুর থেকে প্রায় ২৭ হাজার টন ডিজেল বহনকারী একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। বন্দর ও শিপিং সূত্র জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যে আরও চারটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকার বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এসব জাহাজে মোট প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টনের বেশি ডিজেল আসছে।
বন্দরে পৌঁছানোর অপেক্ষায় থাকা জাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘লিয়ান হুয়ান হু’, ‘এসপিটি থেমিস’, ‘র্যাফেলস সামুরাই’ এবং ‘চাং হাং হং তু’। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৩০ হাজার টনের কাছাকাছি ডিজেল রয়েছে।
শিপিং এজেন্টরা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী জাহাজগুলো আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বন্দরে ভিড়বে। ফলে দেশের জ্বালানি মজুত বাড়বে এবং সরবরাহ পরিস্থিতি আরও স্বস্তিদায়ক হবে। জ্বালানি পরিস্থিতি স্বস্ত্বিদায়ক করতে আরো একটি সুখবর এসেছে আজ। ভারত থেকে এরই মধ্যে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে ৫ হাজার টন ডিজেল।
দৈনিক চাহিদা ও বর্তমান সরবরাহ
বাংলাদেশে সাধারণ সময় দৈনিক প্রায় ১২ হাজার টন ডিজেলের চাহিদা থাকে। তবে বর্তমানে সরকার প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার টন করে সরবরাহ করছে। এই হারে সরবরাহ অব্যাহত থাকলে আসন্ন পাঁচটি চালানে আসা মোট প্রায় এক লাখ ৪৭ হাজার টনের বেশি ডিজেল দিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহের জাতীয় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার জন্য পরিকল্পিতভাবে মজুত ব্যবস্থাপনাও করা হচ্ছে।
বিকল্প উৎস থেকে আমদানির উদ্যোগ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় থাকা কিছু জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ কারণে সরকার বিকল্প উৎস থেকে সরাসরি তেল কেনার উদ্যোগ নিয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল জরুরি ভিত্তিতে আমদানির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
এই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডাইরেক্ট প্রোকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) ব্যবহার করার প্রস্তুতি চলছে। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উত্তর আমেরিকার কয়েকটি জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন যাতে না ঘটে সেজন্য সরকার আগেভাগেই বিকল্প উৎস খুঁজছে। তিনি জানান, এপ্রিল মাসের চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করতে সব সম্ভাব্য উৎস যাচাই করা হচ্ছে।
ভারত ও চীনের সহযোগিতার সম্ভাবনা
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। ভারত ও চীন—দুই দেশই প্রয়োজনে জ্বালানি সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। ভারতের আগ্রহের বাস্তব প্রতিফলন আজ মঙ্গলবার দেখা গেছে। ৫ হাজার টন ডিজেল আসছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, কেবল ভারত বা চীন নয়, আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গেও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে।
এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও চীন যৌথভাবে কাজ করতে প্রস্তুত। প্রয়োজনে বাংলাদেশকে জ্বালানি সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও চীন আগ্রহী।
ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আনার সুযোগ
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান জ্বালানি সহযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে নিয়মিত ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের কথা রয়েছে।
এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেল আমদানির সুযোগ এখনো রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) মনে করছে, মার্চের শেষ সপ্তাহ এবং এপ্রিল মাসের চাহিদা মেটাতে এই অতিরিক্ত সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণ
বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে কিছু নির্ধারিত জ্বালানি চালান বিলম্বিত হয়েছে। বিপিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্চ মাসে প্রায় ২ লাখ ৯৩ হাজার টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা ছিল। তবে প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেলের কিছু চালান বিলম্বিত বা বাতিল হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
কিছু আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জ্বালানি চালান স্থগিত করেছে। এর ফলে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লেও সরকার বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিপিসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে, যা প্রায় দুই সপ্তাহের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
এ ছাড়া দেশে প্রায় ২৩ হাজার টন অকটেন, ১৫ হাজার টন পেট্রোল, প্রায় ৬৭ হাজার টন ফার্নেস অয়েল এবং প্রায় ৬০ হাজার টন জেট এ–১ এভিয়েশন ফুয়েল মজুত রয়েছে। এই মজুত দিয়ে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি
সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার মাঠ পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করেছে। জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি বা মজুতদারি ঠেকাতে দেশের সব জেলা প্রশাসককে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল গঠন করেছে। এসব সেলের মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কৃষি খাতেও নজর
সরকার বলছে, চলমান বোরো মৌসুমে কৃষি সেচ কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয় সেদিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেচের জন্য ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত রাখতে আলাদা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যতই জটিল হোক, বহুমুখী উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং কৌশলগত মজুত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা পাওয়াটা বাংলাদেশের জন্য বড় স্বস্তির বিষয়। একই সঙ্গে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
-পতাকানিউজ

