অধ্যাপক যতীন সরকার। বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি তাঁর সময়কালে অসাধারণ বাগ্মীতায় বাংলা ভাষাভাষীদের ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় স্থান দখল করেছিলেন। অধ্যাপক যতীন সরকার বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং বাংলা ভাষাতত্ত্বের শিক্ষক ছিলেন। একদিকে, তাঁর শ্রেণিকক্ষে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষক, অন্যদিকে তিনি ছিলেন মার্কসীয় দর্শনে অনুপ্রাণিত হাজার হাজার তরুণ যুবার রাজনৈতিক গুরু। অধ্যাপক যতীন সরকার সুসাহিত্যিক, তার চেয়েও বড় পরিচয় তিনি দেশ সেরা একজন প্রাবন্ধিক। একজন চিন্তক। মার্কসীয় শ্রাস্ত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষক।
যতীন সরকারের অসাধারণ আরেকটি বেশিষ্ট্য ছিলো। তিনি প্রচুর পড়াশুনা করতেন। তার চোখের সামনে কোনো বই থাকলে সে বই তাঁর দর্শন শাস্ত্রের বিপরীত মেরুর হলেও তিনি সেটি পড়ার চেষ্টা করতেন, জানার চেষ্টা করতেন। যতীন সরকারের ভাষায় তিনি সবসময় বলতেন, আমি কী জানি না তা আমি জানি কিন্তু তোমরা যে কী জানো না তাও তোমরা জানো না। অর্থাৎ তিনি সবসময়ই বলতেন তিনি কিছুই জানেন না। সে কারণে সবসময়ই তার মধ্যে জানার আর্থাৎ পড়াশুনা করার আগ্রহ বিরাজ করতো।
যতীন সরকার সাহিত্যিক, যতীন সরকার প্রাবন্ধিক, যতীন সরকার রাজনীতিবিদ। আমৃত্যু তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। যতীন সরকার সংগঠক, তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
তিনি বাংলাদেশের অন্যতম সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন। যতীন সরকার সবসময় বলতেন, মানুষের জীবনের অভিষ্ঠ লক্ষ্য হওয়া উচিত সংস্কৃতি আর সেই সংস্কৃতির অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য মাধ্যম হওয়া উচিত রাজনীতি। যে সংস্কৃতি মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করবে, বৈষম্য দূর করবে, যে সংস্কৃতি মুক্ত মানবের মুক্ত পৃথিবী গড়বে। এই সংস্কৃতির জন্য যতীন সরকার আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন। যতীন সরকার এই দেশে মুক্ত বুদ্ধি চর্চায় অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। মুক্তবাতায়ন পাঠচক্র নামে তিনি মানুষের মাঝে মুক্তবুদ্ধি চর্চাকে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে এক বিশাল ভূমিকা পালন করেছেন। যতীন সরকার ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মাঝে সৎভাব বজায় রাখার জন্য আন্তঃধর্মীয় সংলাপ কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
তাঁর লিখিত ছোটদের জন্য ‘গল্পে গল্পে ব্যাকরণ’ এবং ‘ব্যাকরণের ভয় অকারণ’ বই দু’টি বাংলা ব্যাকরণের মতো কঠিন বিষয়কে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজবোধ্য করে তুলেছে। ‘সাহিত্যের কাছে প্রশ্ন’ তাঁর প্রথম প্রবন্ধ, দুটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনী গ্রন্থ তিনি লিখে গেছেন। একটি হলো ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু- দর্শন’ এবং অন্যটি ‘পাকিস্তানের ভূত দর্শন’। যতীন সরকার ছিলেন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল। প্রগতিশীল রাজনীতিতে জড়িত থাকার কারণে ‘৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। সেখানে বসে তিনি ‘সব পাওয়ার মন্ত্র’ নামে একটি নাটক ও ‘ব্যাকরণের ভয় অকারণ’ রচনা করেন।
যতীন সরকারের প্রথম পুরষ্কার প্রাপ্তি ১৯৬৭ সালে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক। এছাড়া ২০১০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার স্বাধীনতা পদকসহ অসংখ্য পুরষ্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।
অধ্যাপক যতীন সরকার এমন একজন ব্যক্তিত্ব যাঁকে দু’চার/পাঁচ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করা অসম্ভব। তিনি শারীরিকভাবে আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাঁর কর্ম, তাঁর দর্শন আমৃত্যু আমাদের মতো সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের পাথেয় হয়ে থাকবে। তিনি নেই কিন্তু তাঁর হাজারো শিক্ষার্থী, অনুরাগী, ভক্ত ও অনুসারীদের মাঝে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।
লেখক : যতীন সরকারের অনুসারী, আনন্দমোহন কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ও নারী উদ্যোক্তা
পতাকানিউজ/কেএস

