মানুষের হাড় কি গর্ভাবস্থার গোপন কথা বলতে পারে? বিজ্ঞানীরা এতদিন ভেবেছিলেন, প্রাচীন কঙ্কালে গর্ভাবস্থা শনাক্ত করা অসম্ভব। কারণ হাড়ের গঠন প্রায় পুরোটাই অজৈব পদার্থে ভরা, প্রোটিনের চিহ্ন থাকার কথা নয়। কিন্তু গবেষক বার্লো সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি কী পেয়েছেন?
প্রথম থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর সাত নারী ও তিন পুরুষের কঙ্কাল নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন তিনি। হাতিয়ার? এনজাইম-লিঙ্কড ইমিউনোসর্বেন্ট অ্যাসে বা ইএলআইএসএ। এই পদ্ধতি দিয়ে প্রোজেস্টেরনের মতো হরমোন শনাক্ত করা যায় – যে হরমোন গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে আকাশছোঁয়া বাড়ে এবং পুরো ৯ মাস ধরে উঁচুতে থাকে।
ইস্ট্রোজেন ও টেস্টোস্টেরনও বাড়ে, কিন্তু প্রোজেস্টেরনের মতো নয়। তাই তিন হরমোনের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফল? হাড়, দাঁতের ডেন্টিন, এনামেল, ক্যালকুলাস এবং রুট – সবখানেই তিন হরমোনের চিহ্ন মিলেছে।
কিন্তু সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর কী? দাঁতের গঠনে প্রোজেস্টেরনের উচ্চমাত্রা, হাড়ে ইস্ট্রোজেনের উপস্থিতি, আর হাড়ের টিস্যুতে টেস্টোস্টেরনের অভাব – এই তিনের সমন্বয় মৃত্যুর সময় গর্ভাবস্থার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গবেষকরা লিখেছেন, ইএলআইএসএ পদ্ধতি দিয়ে মানুষের কঙ্কালে যৌন হরমোন শনাক্ত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে অতীত জনগোষ্ঠীর প্রজনন ইতিহাস জানা যাবে।
বার্লো বলছেন, ‘এই আবিষ্কার প্রমাণ করছে – কঙ্কালে হরমোন সংরক্ষিত থাকে। দীর্ঘ গবেষণার পর জানা যাবে, কোন নারী কত বয়সে প্রথম গর্ভবতী হয়েছিলেন, গর্ভপাত হয়েছে কি না, একাধিক সন্তানের মধ্যে জন্মের ব্যবধান কত ছিল।’
বিশেষ করে লিখিত ইতিহাসহীন যুগের জন্য এ যেন সোনার খনি।
তবে কি এখনই প্রাচীন কঙ্কাল থেকে গর্ভাবস্থার সার্টিফিকেট বের করা যাবে? না। বার্লো সতর্ক করছেন – আরও কাজ বাকি।
প্রথমত, জীবিত মানুষের বিস্তারিত চিকিৎসা রেকর্ড নিয়ে বড় গবেষণা করে হাড়ে হরমোনের স্বাভাবিক মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বোঝা দরকার – হরমোন কীভাবে হাড়-দাঁতে ঢোকে, কীভাবে সংরক্ষিত হয়।
তৃতীয়ত, বিভিন্ন কবরের পরিবেশে হরমোন কতদিন টিকে থাকে, কীভাবে ভেঙে যায় – এর রহস্য ভাঙতে হবে।
লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নিকোলাস লেমোস বলছেন, ‘বিশ্বে এই প্রথম। কিন্তু নমুনা মাত্র ১০ জনের, এর মধ্যে গর্ভবতী ছিলেন মাত্র দুজন। ইএলআইএসএ পদ্ধতির আরও যাচাই দরকার। এটি যুগান্তকারী, কিন্তু এখনও ধারণার প্রমাণ মাত্র – নিয়মিত ডায়াগনস্টিক টুল নয়।’
তিনি যোগ করেন, ‘কাজটি প্রাথমিক পর্যায়ে। তবু অতীতের জীবন-মৃত্যুর হরমোনাল গল্প বোঝার পথ খুলে দিয়েছে।’
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট আলেকজান্ডার কমনিনোস বলছেন, আকর্ষণীয় গবেষণা। অতীতের প্রজনন প্রোফাইল জানলে বোঝা যাবে, সময়ের সঙ্গে এগুলো কীভাবে বদলেছে, ভবিষ্যতের ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, ‘হাড়ে এই হরমোন শনাক্ত করার ক্ষমতা সমকালীন হাড় গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলবে।’
প্রশ্ন থেকেই যায় – হাড় কি সত্যিই আমাদের গোপন জীবনের সাক্ষী? উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও গবেষণার।
পতাকানিউজ/এনটি

