বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমানের বাসা যেভাবে নির্যাতনের শিকার হতো সেই বর্ণনা দিয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে গৃহকর্মী মোহনা। রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তারের কাছে জবানবন্দি দেয় শিশু গৃহকর্মী।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রোবেল মিয়া তাকে আদালতে হাজির করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার আবেদন করেন। পরে আদালত শিশুটির জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। ঢাকার আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই তাহমিনা আক্তার এ তথ্য জানান।
জবানবন্দি শেষে মোহনাকে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯-এর বিচারক শাহাদাৎ হোসেন ভূঁইয়ার আদালতে নেয়া হয়। মোহনার বাবা তাকে জিম্মায় নেয়ার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু মোহনা শারীরিকভাবে এখনও অসুস্থ থাকায় তাকে আবার হাসপাতালে পাঠানো হয়।
মোহনার পরিবারকে আইনি সহায়তা দেয়া বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ফাহমিদা আক্তার রিংকি জানান, মোহনা অসুস্থ থাকায় তাকে আবার হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সুস্থতা সাপেক্ষে বাবার জিম্মায় দেয়ার বিষয়ে শুনানি হবে।
শিশুটিকে নির্যাতনের ঘটনায় তার বাবা গোলাম মোস্তফা গত ১ জানুয়ারি মামলা করেন। মামালায় সাফিকুর রহমান এবং তার স্ত্রী বীথি, বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমকে আসামি করা হয়। মামলার পর তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছেন।
মামলায় বলা হয়, উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে সাফিকুর রহমানের বাসা। ওই বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর শিশুর দেখাশোনার জন্য অল্প বয়সী মেয়ে খুঁজছিলেন। পরে গোলাম মোস্তফার সঙ্গে তার দেখা হয়। মেয়ের বিয়েসহ যাবতীয় খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি পেয়ে মোস্তফা গত বছরের জুনে তার মেয়েকে ওই বাসায় কাজে পাঠান।
সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর ওই বাসায় গিয়ে মোহনাকে দেখে আসেন তিনি। এরপর আর তাকে পরিবারের কারও সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়। সেখানে বলা হয়, ৩১ জানুয়ারি বীথি ফোন করে মোস্তফাকে জানান, মোহনা অসুস্থ, তাকে যেন নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মোহনাকে আনতে যান গোলাম মোস্তফা। সন্ধ্যা ৭টায় গোলাম মোস্তফার কাছে মোহনাকে বুঝিয়ে দেন বীথি।
মোস্তফা মামলায় বলেছেন, তখনই তিনি মেয়ের দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম দেখতে পান। তার মেয়ে ভালোভাবে কথাও বলতে পারছিল না। কারণ জিজ্ঞাসা করলে বিমানের এমডি র স্ত্রী বীথি এর সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে মোহনাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান মোস্তফা। মোহনা তাকে জানায়, ওই বাসায় বিভিন্ন সময়ে তার ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। তাকে মারধর করার পাশাপাশি খুন্তি গরম করে শরীরে ছ্যাঁকাও দেওয়া হয়েছে।
জবানবন্দিতে যা বলেছে মোহনা
মোহনা জবানবন্দিতে বলেছে, ওই বাসায় কাজ করার পর থেকে তাকে প্রতিদিন মারধর করা হতো। এমনি এমনিতেই তারা মারতেন। পুতা দিয়ে তাকে হাত, পা ও পিঠে ছ্যাচা দিত। চুল টেনে টেনে তুলে ফেলত। গরম খুন্তি দিয়ে ছেকা দিত।
মোহনা জবানবন্দিতে আরও বলেছে, সে কোন ক্ষতি করেনি তা সত্ত্বেও তাকে মারধর করা হতো। ম্যাডাম (এমডির স্ত্রী) তাকে বেশি মারতেন। ওই বাসার অন্য গৃহকর্মীরাও মারতেন। এমনকি বাসার সবাই মারধর করতেন।
রিমান্ড আবেদন
এদিকে সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথিসহ চারজনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছে পুলিশ। আজ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রোবেল মিয়া এ আবেদন করেন।
এরপর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহানের আদালত আসামিদের উপস্থিতিতে রিমান্ড শুনানির জন্য আগামী মঙ্গলবার দিন ধার্য করেন।
রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, আসামিদের বিষয়ে অনুসন্ধান করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ভুক্তভোগীকে নির্যাতন করতেন। মামলার ঘটনায় ব্যবহৃত গরম খুন্তি আসামিরা কোথায় রেখেছেন, সে সম্পর্কে জানেন। ভুক্তভোগীর শরীরের ক্ষতচিহ্ন থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ভুক্তভোগীকে অন্যভাবেও পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছে। এটাও আসামিরা জানেন। মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটনসহ মামলার ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদের নাম–ঠিকানা সংগ্রহ ও খুন্তি উদ্ধারের লক্ষ্যে আটক আসামিদের সাত দিনের পুলিশ রিমান্ড প্রয়োজন।
এর আগে ২ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে তিনটায় উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে আসামিদের গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা–পুলিশ। পরে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাফিকুর, তার স্ত্রী বীথিসহ চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে যাওয়া অপর আসামিরা হলেন–ওই বাসার অপর দুই গৃহকর্মী রূপালী খাতুন এবং মোছা. সুফিয়া বেগম। এ নির্যাতনের ঘটনায় সাফিকুরকে বিমানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় সরকার।
পতাকানিউজ/এএ

