ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। বিশেষ করে এই হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদকে ‘বলির পাঁঠা’ বানিয়ে অন্যদের আড়াল করা হলে তা কখনোই ন্যায়বিচার হবে না বলে মন্তব্য করেছেন হাদির বোন মাসুমা হাদি।
তিনি বলেন, ‘পুরো গ্যাং যেন সামনে আসে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হয়। শুধু ফয়সালকে শাস্তি দিয়ে যদি অন্যদের আড়াল করা হয়, তাহলে সেটা কোনোভাবেই ন্যায়বিচার হবে না।’
হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রায় আড়াই মাস পর প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসটিএফ জানায়, গত শনিবার রাতে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বনগাঁ এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়েছে।
প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হলেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছে না হাদির পরিবার। তারা মনে করছেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও শক্তিশালী একটি চক্র রয়েছে, যাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা জরুরি।
সোমবার ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার খাসমহল এলাকার বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মাসুমা হাদি বলেন, ‘ফয়সাল একজন শুটার। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এতে আমরা কিছুটা আশাবাদী যে তার বিচার হবে। কিন্তু এর পেছনে আরও কারা ছিল, কে তাকে নির্দেশ দিয়েছে, কারা অর্থ জুগিয়েছে এবং কারা তাকে জেল থেকে জামিনে বের হতে সহায়তা করেছে—এসব বিষয়ও তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন ব্যক্তিকে হত্যা করার ঘটনা নয়। এর পেছনে পরিকল্পনা ছিল, উদ্দেশ্য ছিল। তাই শুধু একজনকে দায়ী করে তদন্ত শেষ করা হলে প্রকৃত সত্য কখনোই সামনে আসবে না।’
গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান শরীফ ওসমান হাদি। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী গণসংযোগে অংশ নিতে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গেলে হামলার শিকার হন হাদি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় একটি মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। মোটরসাইকেলের পেছনে বসা এক ব্যক্তি কাছ থেকে গুলি করলে তিনি গুরুতর আহত হন।
গুরুতর অবস্থায় প্রথমে তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে রাজধানীর থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে হাদির মৃত্যুর পর মামলাটিতে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারাসহ হত্যার অভিযোগ যুক্ত করা হয়।
প্রাথমিকভাবে থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও পরে মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি)। তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি এবং সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ মোট ১৭ জনকে আসামি করে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় ডিবি।
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ উল্লেখ করেন, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ে হাদির দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা এবং ভোটারদের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে হাদির নির্বাচনী প্রচারণায় অনুপ্রবেশ করে হামলা চালানো হয়েছিল বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
তবে ডিবির দেওয়া এই অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট নয় ইনকিলাব মঞ্চ। মামলার বাদী আব্দুল্লাহ আল জাবের আদালতে নারাজি আবেদন দাখিল করলে আদালত মামলাটি নতুন করে তদন্তের জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দায়িত্ব দেয়।
হাদির বোন মাসুমা হাদি বলেন, ‘আমরা চাই দ্রুত এই মামলার সঠিক তদন্ত হোক এবং প্রকৃত অপরাধীরা যেন আইনের আওতায় আসে। একই সঙ্গে ফয়সাল ও আলমগীরকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।’
ব্যক্তিগত জীবনে শরীফ ওসমান হাদি ঝালকাঠির একটি শিক্ষক পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তার বাবা স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায় তার শিক্ষাজীবন শুরু হলেও পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
এক সময় ইংরেজি শেখানোর প্রতিষ্ঠান সাইফুরস-এ শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি। সর্বশেষ ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস’-এ শিক্ষকতা করছিলেন হাদি।
তার মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির নিকটে তাকে দাফন করা হয়।
পরিবারের দাবি, হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা না হলে এই হত্যার ন্যায়বিচার কখনোই সম্পূর্ণ হবে না।
-পতাকানিউজ

