কুমিল্লা–৪ (দেবীদ্বার) আসনে হঠাৎ করেই বদলে গেছে নির্বাচনী সমীকরণ। বিএনপির প্রার্থী ও চারবারের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় আপাতত এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক নেই। এতে করে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
তবে ভোটের দিন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি, ব্যালট পেপার ধানের শীষবিহীনই থাকবে—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। কারণ, মনোনয়ন ফিরে পাওয়ার একটি শেষ সুযোগ এখনো খোলা আছে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর সামনে।
কীভাবে বাতিল হলো মনোনয়ন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দেবীদ্বার উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা–৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। রিটার্নিং কর্মকর্তার প্রাথমিক যাচাইয়ে তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত হয়েছিল।
কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন। অভিযোগে বলা হয়, বিএনপির প্রার্থী ঋণখেলাপি হওয়ার তথ্য গোপন করে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। নির্বাচন কমিশন গত শনিবার সেই আপিল মঞ্জুর করলে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়।
কেন মনোনয়ন বাতিল হয়
এবারের নির্বাচনে যেসব কারণে প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—ঋণখেলাপি হওয়া, দ্বৈত নাগরিকত্ব, তথ্য গোপন, দলীয় মনোনয়নপত্রে গরমিল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষরে ত্রুটি।
ভোটারের সই সংগ্রহ বা ছোটখাটো ত্রুটির কারণে বাতিল হওয়া অধিকাংশ প্রার্থীই আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব, ঋণখেলাপি ও দলীয় কাগজপত্রে অসংগতির অভিযোগে বাতিল হওয়া মনোনয়নগুলো বহাল থাকছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, মনোনয়ন যাচাইয়ের সময় যোগ্যতা ও কাগজপত্রে সমস্যা পেলে রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রার্থিতা বাতিল করতে পারেন। এরপর প্রার্থী নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারেন। শুনানি শেষে ইসি আপিল গ্রহণ বা খারিজের সিদ্ধান্ত দেয়।
আপিল গ্রহণ বা খারিজ—এর পরিণতি কী
আপিল গ্রহণ হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর মনোনয়ন পুনর্বহাল হয় এবং তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময় পর্যন্ত প্রার্থিতা বহাল থাকলে চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম ও প্রতীক অন্তর্ভুক্ত হয়।
অন্যদিকে, আপিল খারিজ হলে প্রার্থী কার্যত নির্বাচনের মাঠ থেকে ছিটকে পড়েন। আরপিও অনুযায়ী, মনোনয়নসংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
মঞ্জুরুল আহসানের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। তাঁর নিজের করা আপিল নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী হাসনাত আবদুল্লাহর করা আপিল মঞ্জুর হওয়ায় তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। যদিও মঞ্জুরুল আহসানও হাসনাত আবদুল্লাহর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন, সেটি নামঞ্জুর হওয়ায় হাসনাতের প্রার্থিতা বহাল আছে।
শেষ ভরসা হাইকোর্ট
ইসিতে আপিল খারিজ হওয়ার পর উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকে প্রার্থীদের। তবে নির্বাচনী সময়সূচির মধ্যে রায় পাওয়া অনিশ্চিত। বিশেষ করে, নির্বাচন কমিশন এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে কাজ করেছে বা চরম অন্যায় হয়েছে—এমন প্রমাণ দেখাতে না পারলে আদালত সাধারণত হস্তক্ষেপ করে না।
এর আগে এমন নজির রয়েছে। ২০০৮ সালে মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী আদালতের রায়ে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছিলেন।
হাল ছাড়ছেন না মঞ্জুরুল আহসান
মনোনয়ন বাতিলের পরও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। ইসির রায়ের পর তিনি ফেসবুকে লেখেন, ‘প্রিয় দেবীদ্বারবাসী ও আমার দলের নেতা-কর্মী ভাইয়েরা, দৃঢ় বিশ্বাস ও ধৈর্য রাখুন। আল্লাহই সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী।’
তাঁর কর্মী-সমর্থকদের ভাষ্য, উচ্চ আদালত থেকে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
ওই আসনের আরো প্রার্থী
কুমিল্লা–৪ আসনে হাসনাত আবদুল্লাহ (মনোনয়নপত্রে নাম মো. আবুল হাসনাত) ছাড়াও মাঠে রয়েছেন আরও চার প্রার্থী। তাঁরা হলেন—ইনসানিয়াত বিপ্লবের ইরফানুল হক সরকার, খেলাফত মজলিসের মজিবুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের জসিম উদ্দিন এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মোফাজ্জল হোসেন।
-পতাকানিউজ

