ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ১২ মার্চ বেলা ১১টায় বসছে। নতুন সংসদের সূচনা অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তার সভাপতিত্বেই নতুন স্পিকার নির্বাচনসহ সংসদের প্রাথমিক সাংবিধানিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংসদ সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিদায়ি সংসদের স্পিকার পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকার একাধিক মামলায় কারাগারে থাকায় এবারের অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব কে করবেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সংসদীয় অঙ্গনে আলোচনা চলছিল। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো সদস্য প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পারেন। সেই বিধান অনুসারেই জ্যেষ্ঠ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্পিকার নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম
প্রথম অধিবেশনের সূচিতে রয়েছে নতুন স্পিকার নির্বাচন, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনয়ন এবং শোক প্রস্তাব উত্থাপন। এছাড়া বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা বিভিন্ন অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে, যা নতুন সংসদের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার অনুপস্থিত থাকলে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। তবে নতুন স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন সভাপতিত্বকারী সদস্য।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় জ্যেষ্ঠ সদস্যের দায়িত্ব
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৯৭৩ সালে সরকারি দল ও বিরোধী দলের আলোচনার ভিত্তিতে একজন জ্যেষ্ঠ সদস্যকে প্রথম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার নজির রয়েছে। সংসদীয় ঐতিহ্যের সেই ধারাবাহিকতাই এবার অনুসরণ করা হচ্ছে বলে সংসদসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ সংসদীয় জীবন এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার বিবেচনায় ড. মোশাররফকে দায়িত্ব দেওয়াকে স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবন
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গয়েশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতা, গবেষণা এবং লেখালেখির পাশাপাশি তিনি ভূ-বিজ্ঞানী ও কলামিস্ট হিসেবেও পরিচিত।
১৯৭৯ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। পরে দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন এবং মন্ত্রিসভায় স্থান পান।
তিনি তিন মেয়াদে মন্ত্রী এবং পাঁচবারের সংসদ-সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপি সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
নির্বাচনি এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড
সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিজ নির্বাচনি এলাকা দাউদকান্দিতে বেশ কয়েকটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেন ড. মোশাররফ। তার উদ্যোগে দাউদকান্দি পৌরসভা প্রতিষ্ঠা, তিতাস নামে নতুন উপজেলা গঠন এবং মেঘনা উপজেলা বাস্তবায়নের মতো প্রশাসনিক পরিবর্তন ঘটে, যা স্থানীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন।
এছাড়া তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন এবং মৎস্য খাত উন্নয়নে অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশে স্বর্ণপদকসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
রাজনৈতিক জীবনের চড়াই-উতরাই
রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার গ্রেফতার ও কারাবরণও করতে হয়েছে তাকে। ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৭, ২০১২ ও ২০১৪ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার হয়ে মোট প্রায় পাঁচ বছর কারাভোগ করেন তিনি। এসব মামলাকে তিনি ‘মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক’ বলে উল্লেখ করে আসছেন।
১৯৯৪ সাল থেকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
লেখক হিসেবেও পরিচিত
রাজনীতির পাশাপাশি লেখক হিসেবেও সক্রিয় ড. মোশাররফ। তার লেখা ১৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘মুক্তিযুদ্ধে বিলাত প্রবাসীদের অবদান’, ‘প্লাবন ভূমিতে মৎস্যচাষ : দাউদকান্দি মডেল’, ‘সংসদে কথা বলা যায়’, ‘এই সময়ের কিছু কথা’, ‘ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিনের কারাগারে ৬১৬ দিন’, ‘রাজনীতির হালচাল’, ‘সময়ের ভাবনা’, ‘জরুরি আইনের সরকারের দুই বছর’, ‘মূল্যবোধ অবক্ষয়ের খণ্ডচিত্র’, ‘প্রগতি ও সত্যের সন্ধানে’, ‘করোনাকালে বাংলাদেশ : সংক্রমণের দশ মাস’, ‘স্মৃতির অ্যালবাম’ এবং ‘আমার রাজনীতির রোজনামচা’।
নতুন সংসদ ঘিরে প্রত্যাশা
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংসদের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে শুরু, আইন প্রণয়ন কার্যক্রম সক্রিয় করা এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর করার বিষয়ে নজর থাকবে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যের সভাপতিত্বে প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়া সংসদীয় প্রক্রিয়ার জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করবে। নতুন স্পিকার নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রম।
-পতাকানিউজ

