হবিগঞ্জে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১৩২টি আবাসিক প্লটের বিপরীতে জমা পড়েছে ৬৯৬টি আবেদন। আবেদন গ্রহণের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি লটারি। প্লট পাওয়ার আশায় দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা আবেদনকারীদের অভিযোগ, অজ্ঞাত কারণে লটারি স্থগিত রেখে নতুন করে আবেদন গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে তাঁদের মধ্যে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৬ সালে হবিগঞ্জ শহরতলির ধূলিয়াখালে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ‘সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট প্রকল্প’ গ্রহণ করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সিলেট বিভাগ। ২০১৭ সালে প্রকল্পটির ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) অনুমোদন পায়। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ এবং ভূমি উন্নয়নের জন্য মাটি ভরাটের কাজ সম্পন্ন করেছে কর্তৃপক্ষ।
চলতি বছরের প্রথম দিকে প্লট বরাদ্দের জন্য বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আবেদন আহ্বান করা হয়। আড়াই থেকে পাঁচ কাঠা ও তদূর্ধ্ব আয়তনের মোট ১৩২টি প্লটের জন্য এক হাজার টাকা মূল্যের প্রায় ১ হাজার ১০০টি আবেদনপত্র বিক্রি হয়। আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল গত ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জামানতসহ মোট ৬৯৬টি আবেদন জমা পড়ে। চার কাঠা ও তদূর্ধ্ব আয়তনের প্লটের জন্য দুই লাখ টাকা এবং চার কাঠার নিচের প্লটের জন্য দেড় লাখ টাকা করে জামানত নেওয়া হয়। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের অনুকূলে জমা হওয়া এসব জামানতের পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।
আবেদন গ্রহণের পর সাত মাস পেরিয়ে গেলেও লটারি না হওয়ায় অনিশ্চয়তায় রয়েছেন প্লটপ্রত্যাশীরা। তাঁদের অভিযোগ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ জামানতের টাকা দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃপক্ষের কাছে পড়ে রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা বলেন, লটারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তবে হবিগঞ্জের একজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতার অনুরোধে গণপূর্তমন্ত্রী পুনরায় আবেদন গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করায় লটারি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। শিগগিরই নতুন করে আবেদন গ্রহণের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হতে পারে বলেও জানান তিনি। তবে ওই নেতার নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি এই কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সিলেট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নেজামুল হক মজুমদার বলেন, ‘নতুন করে আবেদন নেওয়ার বিষয়টি শুনতেছি। তবে এখনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা পাইনি।’
নতুন করে আবেদন গ্রহণের উদ্যোগের খবরে ক্ষোভ জানিয়েছেন এরই মধ্যে আবেদন করা প্লটপ্রত্যাশীরা। শিপা আক্তার নামে এক আবেদনকারী বলেন, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ড নীতি-নৈতিকতার পরিপন্থী। যেখানে ১৩২টি প্লটের বিপরীতে প্রায় সাত গুণ আবেদন জমা পড়েছে, সেখানে প্লটের সংখ্যা না বাড়িয়ে কেন পুনরায় আবেদন গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়।’
আরেক আবেদনকারী এনাম বলেন, ‘পুনরায় আবেদনের সুযোগ দেওয়া মানেই দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার পাঁয়তারা কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।’
আবেদনকারীদের দাবি, ইতোমধ্যে নিয়ম মেনে আবেদন করা ব্যক্তিদের আবেদন বহাল রেখে দ্রুত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ লটারির মাধ্যমে প্লট বরাদ্দ দিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মহলের সুপারিশে লটারি স্থগিত না করে প্রকল্পের নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগের বিষয়ে হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ মো. জি কে গউছ বলেন, ‘নতুন করে আবেদন নেওয়া হলে ক্ষতি কী? হাজার হাজার আবেদন বিক্রি হলে সরকারের কোষাগারে রাজস্ব বাড়বে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আবেদন নেওয়া হয়েছে, তা হয়তো অনেকেই জানেন না। আমি চাই আরও বেশি আবেদন পড়ুক। তবে নিরপেক্ষভাবে লটারি হচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জ জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট ত্রিলোক কান্তি চৌধুরী বিজন বলেন, এভাবে নিয়ম ভাঙা হলে সব ক্ষেত্রেই অনিয়মের সুযোগ তৈরি হবে। হবিগঞ্জে আবাসিক সংকট রয়েছে। তাঁর মতে, প্লটের সংখ্যা না বাড়িয়ে প্রায় সাত গুণ বেশি আবেদন পাওয়ার পরও নতুন করে আবেদনের সুযোগ দেওয়া সময় ও অর্থের অপচয়।
এ বিষয়ে জানতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসাম্মৎ ফেরদৌসী বেগমের দপ্তরের ফোন ও ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে গত দুই দিনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
-পতাকানিউজ/এসসি

