ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। গত মঙ্গলবার তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে ৫০ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদ, যেখানে প্রধানমন্ত্রীসহ মোট ৪১ জনই প্রথমবারের মতো মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে নতুন এই মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নিয়ে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একই দিনে শপথ নেন আরও ৪৯ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। এদের মধ্যে রয়েছেন ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। সংখ্যার দিক থেকে নতুন মুখের আধিক্যই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। মন্ত্রিসভার বড় অংশ নবীন হওয়ায় প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে কি না—এই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
তবে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের দাবি, মন্ত্রিসভায় নতুনদের সংখ্যা বেশি হলেও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদে অভিজ্ঞ ও প্রবীণ ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে। তাদের মতে, নবীন ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত এই কাঠামো সরকারের কার্যক্রম পরিচালনায় ভারসাম্য তৈরি করবে এবং নীতিনির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
নতুন মন্ত্রিসভার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রধানমন্ত্রী নিজেও প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং একই সঙ্গে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। পূর্ণমন্ত্রীদের মধ্যে আগে বিএনপির বিভিন্ন সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন এমন সদস্যের সংখ্যা মাত্র ৯ জন। বাকি ১৬ জনই প্রথমবারের মতো পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া ২৪ জনের সবাই নতুন, যা মন্ত্রিসভাকে আরও নতুনত্ব দিয়েছে।
প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া ৯ জন হলেন—ফেনী-৩ আসনের আবদুল আউয়াল মিন্টু, দিনাজপুর-৬ আসনের আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, সিলেট-১ আসনের খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, সিলেট-৪ আসনের আরিফুল হক চৌধুরী, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের আফরোজা খানম, ঝিনাইদহ-১ আসনের মো. আসাদুজ্জামান, পার্বত্য রাঙামাটি আসনের দীপেন দেওয়ান, টাঙ্গাইল-১ আসনের ফকির মাহবুব আনাম এবং ঢাকা-১০ আসনের শেখ রবিউল আলম।
প্রতিমন্ত্রীদের ক্ষেত্রেও নতুন মুখের আধিক্য স্পষ্ট। ২৪ প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ২১ জনই এবার প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি তিনজনের মধ্যে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ও আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম এর আগে সংসদ সদস্য ছিলেন। এছাড়া জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক সংসদ সদস্য না হয়েও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিলেও তিনি জয়ী হননি; তাঁকে টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে।
টেকনোক্র্যাট কোটায় তিনজন
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নন এমন ব্যক্তিকেও মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী, তবে মোট সদস্যের এক-দশমাংশের বেশি নয়। এই বিধান অনুসারে বর্তমান মন্ত্রিসভায় তিনজন টেকনোক্র্যাট অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যুক্ত হয়েছেন আমিনুল হক।
পুরোনো অভিজ্ঞতার উপস্থিতি
নতুনদের ভিড়ের মধ্যেও অভিজ্ঞতার ছাপ রয়েছে। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা ৯ জন নেতা এবারও মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। তাঁরা হলেন—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, নিতাই রায় চৌধুরী, আসাদুল হাবিব দুলু এবং আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
নারী প্রতিনিধিত্ব
নতুন মন্ত্রিসভায় নারী সদস্য রয়েছেন তিনজন। পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মানিকগঞ্জ-৩ আসনের আফরোজা খানম। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে রয়েছেন ফরিদপুর-২ আসনের শামা ওবায়েদ এবং নাটোর-১ আসনের ফারজানা শারমীন। তিনজনই এবার প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং প্রথমবার মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়েছেন।
সব মিলিয়ে, নবীন মুখের আধিক্যে গঠিত এই মন্ত্রিসভা আগামী দিনে কতটা কার্যকরভাবে প্রশাসন পরিচালনা করতে পারবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অভিজ্ঞদের পরামর্শ এবং নতুনদের উদ্যম—এই সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে নতুন সরকারের পথচলার গতি ও সাফল্য।
-পতাকানিউজ

