আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের নির্বাচনী মাঠ দ্রুতই রক্তাক্ত হয়ে উঠছে। প্রচার শুরুর পর প্রথম আট দিনেই সারাদেশে অন্তত ৪২টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চারজন, আহত হয়েছেন আরও ৩৫৩ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) প্রকাশিত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এমন উদ্বেগজনক চিত্রই তুলে ধরেছে।
এমন বাস্তবতায় ভোটাদের মনে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, ধারাবাহিকভাবে নির্বাচনী সহিংসতা চলতে থাকলে এবং প্রাণহানি হলে নির্বাচন পরবর্তী সময় পর্যন্ত আর কতো মানুষের প্রাণ যাবে? রাজনৈতিক দলগুলো সংযম না হলে এমন প্রাণহানি চলতে থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সংঘটিত এসব ঘটনায় হামলা, দলীয় সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেওয়ার মতো সহিংস কর্মকাণ্ডের আধিক্য ছিল। শুধু জানুয়ারির প্রথম ২৯ দিনেই রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ গেছে অন্তত ১০ জনের।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ১১ ডিসেম্বর থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট ২০০টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এ সময় চারজন নিহত হয়েছেন।
ঘটনার মধ্যে রয়েছে ৭৩টি সংঘর্ষ, প্রার্থীদের ওপর ৯টি হামলা, ২২টি প্রচারকাজে বাধা, ১৪টি প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর, ১৫টি আক্রমণাত্মক আচরণ, ১১টি অবরোধ ও বিক্ষোভ, ৮টি হুমকি-ভীতি প্রদর্শন এবং সংখ্যালঘুদের ওপর অন্তত একটি হামলার ঘটনা।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, সহিংসতার গ্রাফ এখনো নিম্নমুখী হয়নি।
নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে বিশ্লেষকদের শঙ্কা স্পষ্ট। তাঁদের মতে, এই ধারা থামানো না গেলে ভোটের দিন ও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। এতে সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়বে এবং ভোটকেন্দ্রমুখী হওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। একই দিনে ‘জুলাই সংস্কার সনদ’ নিয়ে দেশব্যাপী গণভোটও হওয়ার কথা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, নির্বাচন সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাঁর ভাষায়, “নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার অনেক চেষ্টা ব্যর্থ করা হয়েছে। দু-একটি ঘটনা পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জন্য বড় বাধা নয়। বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচনেই কমবেশি সংঘর্ষ ঘটে।”
পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, সার্বিকভাবে নির্বাচনী পরিবেশ এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে নিহতদের মধ্যে একজন নারী, যিনি রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না—এই তথ্যকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা আবু আহমেদ ফজলুল করিম বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আরও কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ধারাবাহিক রূপ নেয়। সেই ধারা ২০২৫ সালজুড়েই অব্যাহত থাকে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে অন্তত ৪০৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং চার হাজার ৪৮৮ জন আহত হন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অন্তত ১৫টি সংঘর্ষে ৫৪ জন আহত ও ১০ জন নিহত হন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৩০টি সংঘর্ষে আহত হন ৩০ জন, নিহত হন তিনজন। বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যেও চারটি সংঘর্ষে একাধিক ব্যক্তি আহত হন।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে—১৯টি সংঘর্ষে প্রাণ যায় অন্তত ৩০ জনের, আহত হন প্রায় দুই হাজার ৩০৮ জন। ২০২৫ সালে সারাদেশে দুর্বৃত্তদের হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়া ও নিখোঁজের ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমপক্ষে ১১১ নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
সহিংসতার খণ্ডচিত্র
শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী–ঝিনাইগাতী) আসনে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হন শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম। ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসন কার্যালয়ের কাছে নির্বাচনী প্রচারে চেয়ার বসানো নিয়ে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। নিহত রেজাউল করিম ফুলপুর ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন।
১৬ জানুয়ারি মহাসড়কের পশ্চিম পাশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন একজন ব্যক্তি। তিনি ময়মনসিংহ-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান হোসেনের সমর্থক ছিলেন। ২১ জানুয়ারি নাটোরের সিংড়ায় জয় বাংলা পরিষদের সদস্য মো. রেজাউল করিমকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পাল্টা সহিংসতায় নিহত হন ছাবির হোসেন (১৯)। পরে তাঁর মায়েরও মৃত্যু হয়। ২৪ জানুয়ারি মেহেরপুরের গাংনীতে নারী সমাবেশে হামলার অভিযোগ তোলে জামায়াত। একই জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় ১৯ জানুয়ারি দলটির কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। ২৬ জানুয়ারি পটুয়াখালীর দশমিনায় বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সহিংসতার তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে—যা ভোটের মাঠে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
-পতাকানিউজ

