স্বপ্নের ইউরোপে আর যাওয়া হলো না সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ যুবকের। লিবিয়া থেকে রাবারের বোটে করে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে তাদের মৃত্যুর হয়। শনিবার, ২৮ মার্চ তাদের মৃত্যুর খবর পরিবারের কাছে পৌঁছায়। এমন করুণ মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। এদের মৃত্যুতে শুধু পরিবারের লোকজন কিংবা স্বজনরা নয়, পুরো জগন্নাথপুরবাসী শোকাহত।
মারা যাওয়া যুবকরা হলেন- উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিঁয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়েক আহমদ (২৫), ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২২) চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাঈম মিয়া (২৪) একই গ্রামের শামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক (২৩), ও পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (২৬)।
রবিবার, ২৯ মার্চ দুপুরে সরেজমিন নিহত নাঈম মিয়ার বাড়িতে চিলাউড়া গ্রামের গিয়ে দেখা যায়, তার মা আকি বেগম ছেলের মৃত্যুতে হাউ-মাউ করে চিৎকার করে কাঁদছেন। তার বুক ফাটা কান্নার আর্তনাদে কাঁদছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন ‘আমার ছেলেকে দালাল মেরে ফেলেছে, তোমরা আমার ছেলেরে এনে দাও।’
নাঈমের বাবা দুলন মিয়া বলেন, ‘জগন্নাথপুরের ইছগাঁও গ্রামের দালাল আজিজুল ইসলামের সঙ্গে গ্রিসে পাঠানোর জন্য ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে জানুয়ারি মাসে লিবিয়া যায় আমার ছেলে। সেখানে যাওয়ার কিছুদিন পর গ্রিসের গেম দেয়ার কথা বলে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে দালাল। তার দাবীকৃত টাকা পরিশোধ করার পরও গ্রিসে পাঠাতে টালবাহানা করে। অবশেষে ২১ মার্চ গেম দেয়া হয়। কথা ছিল গেম দেয়ার আগে আমাদেরকে জানানো হবে। কিন্তু আমাদের জানানো হয়নি। শনিবার জানতে পারি সাগরে আমার ছেলে মারা গেছে এবং তার মরদেহ সাগরে ফেলে দেয়া হয়েছে।’ এ ঘটনায় তিনি দালালের বিচার দাবি করেন।
একই গ্রামের ইজাজুল হক রেজার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পিনপতন নীরবতা। এলাকার লোকজন ভিড় করছেন বাড়িতে। স্বজন ও প্রতিবেশিরা ইজাজুল হকের পরিবারের লোকজনকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
ইজাজুল হক বাবা সামছুল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছাতক উপজেলার শক্তিগাঁও গ্রামের দালাল দুলাল মিয়ার মাধ্যমে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে ৩ মাস আগে লিবিয়া যায় আমার ছেলে। সেখান থেকে গ্রিসে পাঠানোর কথা। সব টাকা পরিশোধ করা হলেও গ্রিসে পাঠাতে কালক্ষেপণ করতে থাকে দালাল। আমার ছেলে ঈদের আগে ভয়েস বার্তায় জানায়, ‘দালাল আমাদের খাওয়া-দাওয়া দিচ্ছে না। বড় কষ্টে আছি। দোয়া করিও। এরপর আমার ছেলের সঙ্গে আর কথা হয়নি। আমরা দালালের সঙ্গে অনেক চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারিনি। এখনও শুনি আমার ছেলে মারা গেছে।’
প্রতিবেশী ফজলু মিয়া বলেন, ‘দালাল ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে প্ররোচিত করে অনেক পরিবারের সর্বত্র লুটে নিচ্ছে। তাদের কারণে অকালে ঝড়ছে তরতাজা প্রাণ। এদের বিরুদ্ধে আইনানুগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, ‘শনিবার রাতে খবর পেলাম আমার ইউনিয়নের একই গ্রামের দুই যুবক সাগরে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে মারা গেছে। তাদের মৃত্যুতে পুরো গ্রামের মানুষ শোকাহত। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে দালাল চক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের ফাঁদে হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। অকালে প্রাণ হারাচ্ছে শত শত যুবক। দ্রুত সব দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানাচ্ছি।’
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবরর নেন জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরকত উল্লাহ। এসময় তিনি বলেন, ‘ গ্রিস যাওয়ার পথে এ উপজেলার ৫ জন মারা গেছেন। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।’
জগন্নাথপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘৫ তরুণের মৃত্যুর খবর শুনে পুলিশ সব তথ্য সংগ্রহ করছে। ইতিমধ্যে দালালদের চিহ্নিত করতে কাজ শুরু হয়েছে। অভিযোগ পেলে দালালদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
প্রসঙ্গত, ইউরোপের গ্রিস যাওয়ার জন্য দালাল চক্রের সঙ্গে প্রত্যেককে ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা করে চুক্তি করে গত ৩-৪ মাস পূর্বে লিবিয়ায় যান তারা। সেখান থেকে গত ২১ মার্চ রাবার বোটে গ্রিসের উদেশ্যে সাগরপথে যাত্রা করে অভিবাসীরা। (বোটের যাত্রাকে লোকজনের কাছে ‘গেম’ হিসেবে পরিচিত)। বোটে খাবার ও পানির সংকটে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ১৮ জন মারা যান। তাদের মধ্যে জগন্নাথপুরের পাঁচজন। পরে তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেয়া হয়। ওই যাত্রা থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা শনিবার গ্রিসের কোস্টগার্ডকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
পতাকানিউজ/এডি/আরবি

