বরগুনার তালতলী উপজেলার এক প্রান্তিক কৃষক জলিল মীরের হাতে ছিল জমির মূল দলিল। জমির মাপ, খাজনার হিসাব সবই ঠিকঠাক। কিন্তু ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে কর মেটাতে গিয়ে তার চোখ কপালে। তাকে জানানো হলো, বকেয়া ১০ হাজার টাকা। কিন্তু কেন? পঁচাকোড়ালিয়া ইউনিয়ন ভূমি উন্নয়ন কর্মকর্তার উত্তর- কর বকেয়া ও সুদ মিলে এই টাকা হয়েছে। করের বাইরে সামান্য কিছু টাকা নেওয়া হচ্ছে, কারণ তার কাগজপত্রে বেশ অসঙ্গতি রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দাখিলা ফি, জরিমানা, সার্ভিস চার্জের নামে ইচ্ছেমতো অর্থ ধরা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই পুরনো খাজনার হিসাব মুছে দিয়ে নতুন করে ‘বকেয়া’ দেখানো হয়। তবে কাগজপত্রে অসঙ্গতি এমনটি বলে সরকার নির্ধারিত টাকার তুলনায় ৮ থেকে ১০ গুণ বেশি আদায় করা হচ্ছে।
পঁচাকোড়ালিয়া ইউনিয়ন ভূমি উন্নয়ন কর্মকর্তা মহসিন হোসেনের বিরুদ্ধে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাছে লিখিত অভিযোগপত্র জমা পড়েছে।
সম্প্রতি ভূমি কার্যালয়ের ভেতরে ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষমাণ মানুষ। কেউ হাত ঘষছেন হতাশায়, কেউ গুনছেন ধার করা টাকা। ছোটবগীর একাধিক কৃষক বলেন, ‘৯৯৫ টাকার করের জন্য ৮ হাজার টাকা দিয়েছেন। অতিরিক্ত টাকা না দিলে নামজারি আটকে রাখবে।’ ভুক্তভোগীরা বলছেন, দাখিলার হিসাব বদলে দেওয়ার জন্য একটি অনানুষ্ঠানিক ‘চেইন’ সক্রিয়। নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত সুবিধাভোগী আছে। কিন্তু অভিযোগ উত্থাপিত হলেই কর্তৃপক্ষ ‘কম্পিউটার ত্রুটি’ বলে দায় এড়িয়ে যায়।

ইতিপূর্বে লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের তরফে তদন্তের আশ্বাস মিলেছে। পঁচাকোড়ালিয়া ইউনিয়ন ভূমি উন্নয়ন কর্মকর্তা মহসিন খানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার তিনি বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়েছেন। তার আগের দিন সোমবার জলিল মীরের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগে তিনিও লিখিত দিয়েছেন। তদন্তের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভুক্তভোগী কৃষককে ডেকেছেন।
ভুক্তভোগী জলিল মীরের বাড়ি তালতলীর ছোটবগী ইউনিয়নের ছোটবগী গ্রামে। মোট ৩৩ শতাংশ জমির মধ্যে ৮ শতাংশ বিক্রি করার পর অবশিষ্ট ২৫ শতাংশের জন্য ভূমি উন্নয়ন কর জমা দিতে যান তিনি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। লিখিত অভিযোগের ভাষ্য, প্রথমেই সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা দাবি করেন ৩৩ শতাংশের কর বাবদ ১৬ হাজার টাকা। পরে ২৫ শতাংশের জন্য ডেকে নেন আলাদা কক্ষে, সেখানেই চূড়ান্ত প্রস্তাব—১০ হাজার টাকা।
জলিল মীর বলেন, ‘আমি তহশিলদারকে (ভূমি কর্মকর্তা) বললাম, স্যার এত টাকা একসঙ্গে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি তখন বলেন, আজই না দিলে হবে না।’ শেষমেশ মেয়ের বন্ধক রাখা সোনার গয়না বিক্রি করে নগদ টাকা জোগাড় করেন। সেই টাকা দিয়ে গত ১১ মার্চ জমির দাখিলা নেন। সম্প্রতি সেই জমি বিক্রি করতে গিয়ে জলিল মীর জানতে পারেন, ১০ হাজার টাকা নিয়ে তাকে ৯৯৫ টাকার দালিখা দেওয়া হয়েছে। তাই বিষয়টি তিনি সহকারী কমিশনারকে জানান।
পচাঁকোড়ালিয়া ইউনিয়নের ভূমি উন্নয়ন কর্মকর্তা (তহশিলদার) মহসিন খানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে সোমবার দুপুরের দিকে তিনি নিজ কার্যালয়ে তালতলীর সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন। তিনি ভিডিও বক্তব্যে বলেন, জলিল মীরের কাগজে অনেক দ্রুটি ছিল। সেগুলো ঠিক করার পাশাপাশি অনলাইন খরচ, করের বকেয়া মিলিয়ে ১৭ হাজার টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী এলেই অতিরিক্ত টাকা তাকে দিয়ে দেওয়া হবে। এ ঘটনায় জলিল মীর তার বিরুদ্ধে লিখিত দিয়েছেন। সমস্যা সমাধানের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উদ্যোগ নিয়েছেন।
সরকারী কমিশনার (ভূমি)-এর দায়িত্বে থাকা তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উন্মে সালমা বলেন, লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। এছাড়াও আরেকটি মৌখিক অভিযোগও থাকায় কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি যথাযথ আইনের আওতায় আসবেন। এছাড়াও তাকে মৌখিকভাবে কঠোর সতর্ক করা হয়েছে, যেহেতু তদন্ত চলমান।
পতাকানিউজ/আইবিএম

